সেই কর্মকর্তা থাকছেন, খুশি চৌগাছার কৃষকরা

আপডেট: 09:37:51 18/11/2020



img

চৌগাছা (যশোর) প্রতিনিধি : সরকারনির্ধারিত মূল্যে ডিলারদের সার বিক্রি করতে কড়াকড়ি আরোপের পর সার 'ডিলারদের ব্যাপক তদবিরের মুখে' স্ট্যান্ড রিলিজ হওয়া উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা রইচ উদ্দিনের বদলি আদেশ স্থগিত করা হয়েছে।
১৭ নভেম্বর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের পক্ষে উপ পরিচালক (প্রশাসন) মো. ফখরুল হাছান এই আদেশে স্বাক্ষর করেন।
আদেশে বলা হয়েছে, 'কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের বিসিএস (কৃষি) ক্যাডার কর্মকর্তা কেএম শাহাবুদ্দিন আহমেদ (২৪২৫), উপজেলা কৃষি অফিসার, গাংনী, মেহেরপুর ও ২। মো. রইচ উদ্দিন (২৫৪৯), উপজেলা কৃষি অফিসার, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, চৌগাছা, যশোরকে অত্র দপ্তরের স্মারক নং-১২.০১.০০০০.০০০.৮১.০০৩.১৯.২৯০/১(২১), তারিখ- ০৯/১১/২০২০ খ্রি. মূলে যথাক্রমে উপজেলা কৃষি অফিসার, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, চৌগাছা, যশোর ও উপজেলা কৃষি অফিসার, দৌলতপুর, কুষ্টিয়া বদলি/পদায়নের আদেশটি অনিবার্য কারণবশত স্থগিত করা হলো। এ আদেশ অবিলম্বে কার্যকর হবে।'
এর আগে গত ৯ নভেম্বর এক আদেশে সার ডিলারদের অনিয়মের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়ে আলোচিত চৌগাছা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা রইচ উদ্দিনকে স্ট্যান্ড রিলিজ করা হয়। তার 'বদলি আদেশ প্রত্যাহার এবং মুনাফাখোর সার ডিলারদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার দাবিতে' চৌগাছা শহরের ভাস্কর্য মোড়ে মানববন্ধনও করেন কৃষকরা।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ধারাবাহিক অনিয়মের অভিযোগে ও কৃষি বিভাগের নির্দেশনা না মেনে অতিরিক্ত মূল্যে সার বিক্রিসহ নানা অভিযোগে উপজেলা ফার্টিলাইজারি অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ও উপজোলা বিএনপির এক নম্বর যুগ্ম-আহ্বায়ক ও সাবেক সেক্রেটারি ইউনুচ আলী দফাদারের মালিকানাধীন মেসার্স ইউনুচ আলীসহ উপজেলার তিন ডিলারের ডিলারশিপ বাতিলের সুপারিশ করে উপজেলা সার ও বীজ মনিটরিং কমিটি। ওয়ান ইলেভেনের সময়ে অতিরিক্ত মূল্যে সার বিক্রির অভিযোগে উপজেলার এই বিএনপিনেতা ইউনুচ আলী দফাদার গ্রেফতার হয়ে জেল খাটেন। বাতিলের সুপারিশ করা অন্য দুই ডিলার হলেন পাতিবিলা ইউনিয়নের সার ডিলার ফরিদুল ইসলামের মালিকানাধীন মেসার্স ফরিদুল ইসলাম এবং বিএনপি নেতা আতিকুর রহমান লেন্টুর মালিকানাধীন মেসার্স শয়ন ট্রেডার্স। এদের মধ্যে শয়ন ট্রেডার্সের বিরুদ্ধে উত্তোলন করা সার গুদামে না এনে উপজেলার বাইরে বিক্রি করে দেওয়া, অতিরিক্ত মূল্যে সার বিক্রি, মূল্য তালিকা না টাঙানোসহ ধারাবাহিকভাবে কৃষি বিভাগের নির্দেশনা না মানার অভিযোগ রয়েছে। গত ২০ আগস্ট ১৭ মেট্রিক টন ডিএপি সার উত্তোলন করার আগমনি বার্তা দিয়েও সার গুদামে না তোলায় তার বিক্রয় কেন্দ্র বন্ধ করে দেওয়া হয়। ১৭ সেপ্টেম্বর অতিরিক্ত মূল্যে সার বিক্রির অভিযোগে ভ্রাম্যমাণ আদালত জরিমানা করলেও তিনি নিবৃত হননি। এছাড়া ইউনুচ আলী ও ফরিদুল ইসলামের বিরুদ্ধে পর্যাপ্ত সার ধারণক্ষমতাসম্পন্ন (৫০ টন) গুদাম না থাাকা, খুচরা বিক্রয় কেন্দ্র না থাকা, উত্তোলনকৃত সার গুদামে না এনে অন্যত্র বিক্রি করে দেওয়া, ধারাবাহিকভাবে কৃষি বিভাগের নির্দেশনা না মানাসহ বিভিন্ন গুরুতর অভিযোগ রয়েছে।
ব্যবস্থা নেওয়ার আগে কৃত্রিম সার সংকট দেখিয়ে উপজেলায় বিভিন্ন ধরনের সার সরকারি মূল্যের চেয়ে কেজিপ্রতি ৮-১০ টাকা বেশি মূল্যে সার বিক্রি করছেন ডিলাররা শিরোনামে সংবাদ প্রকাশ হলে অভিযানে নামে কৃষি বিভাগ। তখন বিসিআইসি সার ডিলার মেসার্স শয়ন ট্রেডার্সসহ কয়েকজন খুচরা বিক্রেতাকে ভ্রাম্যমাণ আদালত বসিয়ে জরিমানা আদায় করা হয়। গত ১৩ অক্টোবর উপজেলা সার ও বীজ মনিটরিং কমিটির মিটিংয়ে এই সিদ্ধান্ত গৃহীত হওয়ার পরপরই মোটা অংকের টাকা নিয়ে সাংবাদিকসহ বিভিন্ন মহলে তদবির করতে থাকেন অভিযুক্তরা। এরপর তিনজনের ডিলারশিপ বাতিলের সুপারিশের বিষয়ে অধিকতর তদন্ত করা হবে বলে যশোর জেলা সার ও বীজ মনিটরিং কমিটির মিটিংয়ে সিদ্ধান্ত হয়। চৌগাছা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা রইচ উদ্দিনও সেই কমিটির একজন সদস্য। ডিলারদের বিভিন্ন অনিয়মের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ায় এই কর্মকর্তাকে নানাভাবে হুমকি দিতে থাকেন ডিলাররা। এ বিষয়ে তিনি জীবনের নিরাপত্তা চেয়ে চৌগাছা থানায় একটি জিডিও করেন।
সার ডিলারদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়ে আলোচিত উপজেলা কৃষি অফিসার রইচ উদ্দিনকে স্ট্যান্ড রিলিজ করায় চৌগাছার কৃষক সমাজের মধ্যে হতাশা নেমে আসে। মঙ্গলবার কৃষকরা এর বিরুদ্ধে চৌগাছা শহরে মানববন্ধনও করেন।
এদিকে, বুধবার উপজেলা কৃষি অফিসার রইচ উদ্দিনের স্ট্যান্ড রিলিজের আদেশ স্থগিত হওয়ায় সন্তোষ প্রকাশ করেছেন কৃষকরা। এ বিষয়ে জিওলগাড়ী গ্রামের কৃষক আকবর আলী, সিংহঝুলী গ্রামের টনিরাজ, শামছুল হুদা দফাদার, সাবের আলী সরদার, সাইফুল ইসলাম, হুদা ফতেপুর গ্রামের মাওলানা আলী আকবর, মাঝালী গ্রামের শহিদুল ইসলাম, নারায়ণপুর গ্রামের তুহিনুর রহমান, আমিনুর রহমান, মোবারক আলী মুন্সী, তোফাজ্জেল হোসেন, রামকৃষ্ণপুর গ্রামের কৃষক লাভলুসহ বেশ কয়েকজন কৃষকের সঙ্গে কথা বললে তারা সন্তোষ প্রকাশ করেন। তারা বলেন, 'অনিয়মের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া কৃষি অফিসারকে স্ট্যান্ড রিলিজ করা হয়েছে শুনে আমরা মর্মাহত হয়েছিলাম। তার স্ট্যান্ড রিলিজের আদেশ প্রত্যাহার হওয়ায় আমরা সন্তষ্ট। আশা করি, তিনি আগের মতো দুর্নীতিবাজ সার ডিলারদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া অব্যাহত রাখবেন।'
উপজেলা দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটির সদস্য আসাদুজ্জামান মুক্ত বলেন, ‘‘চৌগাছা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা রইচ উদ্দিন একজন সৎ কর্মকর্তা। তিনি সরকারনির্ধারিত মূল্যে যাতে সার কৃষকের হাতে পৌঁছায় সে বিষয়ে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ায় দুর্নীতিবাজ সার ডিলাররা তার বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালাতে থাকেন। তার স্ট্যান্ড রিলিজ আদেশ প্রত্যাহার হওয়ায় আমরা সন্তুষ্ট।’’

আরও পড়ুন