সেই ২০ ছাত্রীর বিয়ের ঘটনা চাপা দিতে তোড়জোড়

আপডেট: 11:11:13 03/12/2020



img

আনোয়ার হোসেন, মণিরামপুর (যশোর) : করোনার বন্ধে যশোরের মণিরামপুরে ২০ ছাত্রীর বাল্য বিয়ের ঘটনা ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা চলেছে। প্রশাসনিক চাপে মাদরাসা কর্তৃপক্ষ এই ঘটনায় গঠিত তদন্ত কমিটিকে গত কয়েক বছরের বাল্যবিয়ের তথ্য সরবরাহ করেছে। একইসঙ্গে মাদরাসা কর্তৃপক্ষ এ বিষয়ে নতুন করে কোনো রিপোর্ট না করার জন্য সাংবাদিকদের অনুরোধ করেছেন।
করোনার কারণে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকার ফাঁকে মণিরামপুরের পাড়িয়ালি আদর্শ বালিকা দাখিল মাদরাসার ২০ ছাত্রীর বাল্যবিয়ের খবর প্রকাশে তোলপাড় শুরু হয়। উদ্বেগজনক বিষয়টি তদন্তে মাঠে নামে প্রশাসন। বুধবার (২ ডিসেম্বর) সন্ধ্যা ও বৃহস্পতিবার (৩ ডিসেম্বর) সকালে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের কয়েকজন কর্মকর্তা বিষয়টি তদন্তে সরেজমিন যান। তদন্তে ২০ ছাত্রীর বাল্যবিয়ের খবর মিললেও বিষয়টি ভিন্নখাতে নিতে প্রশাসনিক তোড়জোড় শুরু হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
একাধিক সূত্রে অভিযোগ মিলছে, প্রশাসনিক চাপে মাদরাসার সুপার আব্দুল হালিম বিষয়টি চাপা দেওয়ার চেষ্টা করছেন। তিনি প্রকৃত তালিকা না দিয়ে গত কয়েকবছরে বাল্যবিয়ের শিকার ছাত্রীদের তালিকা দিয়েছেন। আর সেটা ধরে তদন্ত কাজ সম্পন্ন হয়েছে। তবে এই বিষয়ে সুপার সাংবাদিকদের কাছে মুখ খুলতে রাজি হচ্ছেন না।
মঙ্গলবার রাতে অনলাইন নিউজ পোর্টাল সুবর্ণভূমি ও বুধবার একাধিক পত্রিকায় করোনার বন্ধে এক মাদরাসার ২০ ছাত্রী বাল্য বিয়ে শিরোনামে সংবাদ প্রকাশিত হয়। পরে বুধবার বিকেলে বিষয়টি জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে আয়োজিত অন্য এক অনুষ্ঠানে আলোচনায় উঠে আসে। ঘটনাটি তদন্তের জন্য উপজেলা প্রশাসনকে নির্দেশ দেন জেলা প্রশাসক। সে মোতাবেক ইউএনও সৈয়দ জাকির হাসানের নির্দেশে বৃহস্পতিবার জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা আব্দুল খালেক, উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা বিকাশচন্দ্র সরকার ও উপজেলা মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তা মৌসুমি আক্তার বিষয়টি সরেজমিন তদন্তে যান।
সংশ্লিষ্ট সূ্ত্রে জানা গেছে, তদন্তে ২০ ছাত্রীর বাল্যবিয়ের তথ্য মিলেছে। তবে সেখানে ২০১৭-২০২০ সালের মধ্যে তাদের বিয়ে হয়েছে বলে দেখানো হয়েছে। আর করোনাকালীন বিয়ে দেখানো হয়েছে সপ্তম, অষ্টম, নবম ও দশম শ্রেণির চার ছাত্রীর। বিয়ে পড়ানোর দায়িত্বে ছিলেন কাজী আব্দুর রাজ্জাক ও কাজী রুহুল আমিন। তবে, এই বিষয়ে তদন্ত টিম কোনো তথ্য জানাতে রাজি হননি।
এদিকে একাধিক সূত্র জানিয়েছে, বাল্য বিয়ের সব দায় মাদরাসা সুপারের ওপর চাপিয়ে কর্তৃপক্ষ তাকে সাময়িক বরখাস্তের সিদ্ধান্তে যাচ্ছেন। বাল্যবিয়ে নিরোধে উপজেলা প্রশাসনের বাধ্যবাধকতা থাকলেও সেটা না হওয়ায় প্রশাসনিক দুর্বলতা বেরিয়ে পড়েছে। আর সেই দুর্বলতা ঢাকতে মাদরাসা সুপারের ওপর দায় চাপানো হচ্ছে।
অভিযোগ উঠছে, সকল দায় সংশ্লিষ্ট মাদরাসার সুপার আব্দুল হালিমের ওপর ফেলে তাকে বিষয়টি অস্বীকার করতে চাপ দেওয়া হচ্ছে।
২০ ছাত্রীর বাল্য বিয়ের খবর প্রকাশের পর বিভ্রান্তিতে পড়ে প্রশাসন। তারা বিষয়টি চেপে যেতে সুপারকে চাপ দিচ্ছেন। ফলে সুপার নিজে বাঁচতে বিয়ে হওয়া ছাত্রীদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে অভিভাবকদের বিষয়টি চেপে যেতে পরামর্শ দিয়েছেন। আর সুপার সাংবাদিকদের কাছে দেওয়া করোনাকালীন বাল্যবিয়ের শিকার ছাত্রীদের তালিকা চেপে গিয়ে বিগত কয়েক বছরে বিয়ে হওয়া ছাত্রীদের তালিকা প্রশাসনকে দিয়েছেন। সেই তালিকা ধরে প্রশাসন প্রাথমিক তদন্ত সম্পন্ন করেছেন। যদিও সুপারের অডিও বক্তব্য সুবর্ণভূমির কাছে সংরক্ষিত আছে।
এসব বিষয়ে জানতে চাইলে সুপার সাংবাদিকদের কাছে সত্য ঘটনা আড়ালের চেষ্টা করেন। তিনি কোনো তথ্য না দিয়ে এই বিষয়ে রিপোর্ট না করার অনুরোধ করেন।
এই ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট ইউনিয়নের বাল্যবিয়ে নিরোধ কমিটির সভাপতি ইউপি চেয়ারম্যান শেখরচন্দ্র বলেন, 'ছাত্রীদের বাল্য বিয়ের ব্যাপারে আমার কিছু জানা নেই।'
তদন্ত কমিটির সদস্য উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা বিকাশচন্দ্র সরকার বলেন, 'তদন্ত করে যা পেয়েছি তা লিখিত আকারে ইউএনও-র দপ্তরে জমা দিয়েছি।'
মণিরামপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সৈয়দ জাকির হাসান বলেন, মাদরাসার ছাত্রীদের বাল্য বিয়ের ব্যাপারে যারা জড়িত তাদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি আইনে মামলা করা হবে।

আরও পড়ুন