স্কুলের মাঠ যখন হাট

আপডেট: 01:16:27 23/01/2020



img
img

চুয়াডাঙ্গা প্রতিনিধি : চুয়াডাঙ্গার দামুড়হুদা উপজেলার ইব্রাহিমপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মাঠ দখল করে গড়ে উঠেছে স্থায়ী দোকান ও বাণিজ্যিক হাট। বিদ্যালয় চলাকালীন সপ্তাহে দুই দিন এই হাট বসায় বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের পোহাতে হচ্ছে নানা ভোগান্তি। শিক্ষকদের পাঠদান মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে, ভেঙে পড়েছে শিক্ষা ব্যবস্থা।
বিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, দামুড়হুদা উপজেলার জুড়ানপুর ইউনিয়নের ইব্রাহিমপুর গ্রামে ৯২ শতক জমির ওপর ১৯৩০ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় ইব্রাহিমপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। বর্তমানে এ বিদ্যালয়ে ২৯৫ জন শিক্ষার্থী, আটজন শিক্ষক ও একজন নৈশপ্রহরী রয়েছে। প্রভাবশালী ব্যবসায়ীরা এ বিদ্যালয়ের মাঠেই তৈরি করেছেন স্থায়ী দোকান; এমনকী সেখানে বসিয়েছেন হাটও। দীর্ঘদিন ধরে সপ্তাহে দুই দিন সোম ও বৃহস্পতিবার এ হাট বসছে। হাটের দিন দূর-দূরান্ত থেকে আসা পাইকাররা ট্রাক ও শ্যালো মেশিনচালিত যানবাহন নসিমন, করিমন ও আলমসাধু ভরে কাঁচামাল নিয়ে এসে বিদ্যালয়ের মাঠেই যানবাহনে ওঠানো-নামানো করে। হাটে অস্থায়ী দোকানিরা সবজি ও বিভিন্ন মাল বিক্রি করেন। ফলে শিক্ষার্থীরা মাঠে অবস্থানরত বিভিন্ন যান ও বিক্রেতাদের ভিড়ের মধ্য দিয়ে কোনো রকমে বিদ্যালয়ে যাতায়াত করে। হট্টগোলের মধ্যে তাদের ক্লাস করতেও সমস্যা হয়। যে কারণে অনেক অভিভাবক হাটের দিনে তাদের সন্তানকে বিদ্যালয়ে যেতে দিতে চায় না। বিষয়টি নিয়ে চরম উদ্বিগ্ন হলেও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ও স্থানীয় প্রশাসনের কোনো নজর নেই বলে অভিযোগ অভিভাবকদের।
সরেজমিনে দেখা যায়, বিদ্যালয়ের মাঠে ব্যবসায়ীরা পণ্যের পসরা সাজিয়ে বসে আছেন। ক্রেতারা দরদাম করে পণ্য কিনছেন। এর মধ্যেই বিদ্যালয়ে চলছে পাঠদান। ক্রেতা-বিক্রেতাদের শোরগোলে শ্রেণিকক্ষে শিক্ষকেরা কী পড়াচ্ছেন, তা শিক্ষার্থীদের বোঝার কোনো উপায় নেই। শিক্ষার্থীদের পাঠেও থাকে না মনোযোগ। শ্রেণিকক্ষের পাশেই রয়েছে হাটের ময়লা-আবর্জনার স্তূপ। মাঠের দক্ষিণ-পূর্ব দিকে রয়েছে ২৪টি পাকা দোকানঘর। বিদ্যালয়ের প্রায় ২০ শতক জমি দখল করে এসব দোকান অবৈধভাবে গড়ে তুলেছেন স্থানীয় কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তি।
পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী জেনিফার আক্তার লাইলা বলে, ‘সপ্তাহের সোম আর বৃহস্পতিবার স্কুলে আসতে মন চায় না। চারদিকের চিৎকার-চেচামেচি ও মাইকের শব্দে ঠিকমতো ক্লাস করতে পারি না। সপ্তাহের অন্য দিন মাঠ ফাঁকা থাকলেও হাটের ময়লা-আবর্জনার পচা গন্ধে প্রতিদিনই ক্লাস করতে সমস্যা হয়, মাঠে খেলাধুলা করতেও কষ্ট হয়।’
খানজাহান আলী নামে এক অভিভাবক বললেন, ‘শিশুরা তো লেখাপড়া-খেলাধুলার মধ্যে দিয়েই শিখবে। স্কুলের মাঠ দখল করে দোকান তৈরি, বেচাকেনার জন্য নিয়মিত হাট বসানো এবং তা সরকারিভাবে বন্দোবস্ত দেওয়া কতটা যুক্তিযুক্ত জানা নেই আমার।’
প্রতিষ্ঠানটির প্রধান আব্দুর রহমান বলেন, ‘বিদ্যালয়ের নানাবিধ সমস্যা সমাধানের জন্য বিভিন্ন সময় দামুড়হুদা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা হয়েছে। কিন্তু কার্যকর সমাধান মেলেনি। বিশেষ করে বিদ্যালয়ের জমিতে অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ, বিদ্যালয় মাঠে সপ্তাহে দুই দিন হাট বসানো বন্ধ করা জরুরি। জনকল্যাণে গুণগত শিক্ষার পরিবেশ তৈরি এবং সরকারি সম্পত্তি রক্ষায় এ বিষয়গুলোর দ্রুত সমাধান হতে হবে।’
বিদ্যালয় ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি আনিছুর রহমান শেখ বলেন, ‘শিশুরা স্কুলে শুধুমাত্র লেখাপড়া করতে আসে না, খেলাধুলাও করতে আসে। তাদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশে বিদ্যালয়ের মাঠ থেকে হাট অপসারণসহ অন্য সমস্যাগুলোর দ্রুত সমাধান হওয়া প্রয়োজন। বিষয়গুলো নিয়ে বহুবার আমরা শিক্ষা কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলেছি। তারা আমাদের সমাধানের আশ্বাস দিয়েছেন, কিন্তু কাজ হয়নি।’
এ বিষয়ে দামুড়হুদা উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা সাকী সালাম বলেন, ‘বিদ্যালয়ের মাঠ থেকে হাট ও অবৈধ স্থাপনা অপসারণে দামুড়হুদা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে লিখিতভাবে জানানো হয়েছে। ইতিমধ্যে এ বিষয়ে শুনানি শেষ হয়েছে। আশা রাখি দ্রুত সমাধান হবে।’
দামুড়হুদা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এস এম মুনিম লিংকন বলেন, ‘এসি ল্যান্ড মহিউদ্দিনকে বিষয়টি তদন্তের জন্য দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। তিনি তদন্ত করেছেন। তবে এখনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।’

আরও পড়ুন