সড়ক নির্মাণে অনিয়ম, দুর্ভোগে ৩০ গ্রামের মানুষ

আপডেট: 02:18:03 10/01/2021



img

মৌসুমী নিলু, নড়াইল : চার বছরেও শেষ হয়নি নড়াইলের লোহাগড়া উপজেলার সত্রহাজারী-ব্রাহ্মণডাঙ্গা সড়ক নির্মাণের কাজ। দুই ঠিকাদারের অনিয়ম ও দুর্নীতিতে কারণে দীর্ঘ এ সময় ধরে দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন হান্দলা গ্রামসহ পাশ^বর্তী তিনটি ইউনিয়নের অন্তত ৩০টি গ্রামের মানুষ। এ অবস্থায় এলাকাবাসী দ্রুত সড়কটি পাকাকরণের কাজ সম্পন্নের দাবি জানিয়েছেন।
এলজিইডি অফিস সূত্রে জানা গেছে, একটি সড়কের জন্য দীর্ঘদিন ধরে দুর্ভোগ পোহাচ্ছিলেন লোহাগড়া উপজেলার লাহুড়িয়া, শালনগর ও নোয়াগ্রাম ইউনিয়নসহ আশপাশের এলাকার মানুষ। স্থানীয়দের দুর্ভোগ দূর করতে ২০১৭ সালের জানুয়ারি মাসে হান্দলা থেকে ব্রাক্ষ্মণডাঙ্গা পূর্বপাড়া মাদ্রাসা পর্যন্ত প্রায় দুই কিলোমিটার সড়ক পাকাকরনের কাজ শুরু হয়। প্রথমে কাজটি চুক্তিবদ্ধ হন ফরিদপুরের ঠিকাদার আকরাম হোসেন রাজা। তিনি প্রথমে রাস্তাটি খুড়ে ব্যবসায়িক সমস্যার কারণে ফেলে রেখে চলে যান। এরপরই হান্দলা গ্রামসহ আশপাশের গ্রামবাসীর দুর্ভোগ শুরু হয়। বর্ষাকালে রাস্তাটি খালে পরিণত হয়। সড়কটি চলাচলের অযোগ্য হওয়ায় এলজিইডি কর্তৃপক্ষ ওই কাজটি বাতিল করে পুনরায় টেন্ডার করতেই সময় নয় প্রায় আড়াই বছর।
সড়কটি পুনরায় টেন্ডার হলে কাজ পান নড়াইলের ইডেন প্রাইজ নামে একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। ওই প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে কাজটি কিনে নেন লাহুড়িয়া গ্রামের ঠিকাদার কামরুজ্জামান কোমর। এক বছর আগে কাজ শুরু করেই তিনি পোড়ামাটি ও নি¤œমানের খোয়া ব্যবহার শুরু করেন। স্থানীয় জনগনের বাধায় ছয় মাস কাজ বন্ধ থাকার পর নি¤œমানের খোয়া সরিয়ে নিয়ে নেন। পুনরায় গত বছরের ডিসেম্বর মাসে কাজ শুরু করেন ওই ঠিকাদার। রাস্তায় প্রথম স্তরে দশ ইঞ্চি বালি দেওয়ার পর দ্বিতীয় স্তরে বালি-খোয়ার সংমিশ্রণের কাজ শুরু হয়। অর্ধেক বালি ও অর্ধেক খোয়ার সংমিশ্রণে ছয় ইঞ্চি পুরু করার কথা থাকলেও সেখানে সর্বোচ্চ ২৫ ভাগ খোয়া এবং ৭৫ ভাগ বালি দেওয়া হয়েছে। এছাড়া যে খোয়া ব্যবহার করা হয়েছে তা অত্যান্ত নিম্নমানের।
হান্দলা গ্রামের বাসিন্দা আব্দুল কাদের, চরব্রাহ্মণডাঙ্গা গ্রামের বাসিন্দা আবুল কাশেমসহ একাধিক ব্যক্তি জানান, ওই ঠিকাদার কিছুদিন আগে যে নিম্নমানের খোয়া সরিয়ে নিয়েছিলেন, সেই খোয়া-বালি মিশিয়ে আবার রাস্তায় দিয়েছেন। হান্দলা স্কুলমাঠে ভালো মানের কিছু খোয়া রাখা হয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্র্তৃপক্ষকে দেখানোর জন্য।
নোয়াগ্রাম ইউপি সদস্য হান্দলা গ্রামের বাসিন্দা শারফুজ্জামান বোরাক বলেন, ‘এই সড়কটি নড়াইল জেলা শহরের সাথে জেলার উত্তরাঞ্চলের লাহুড়িয়া, শালনগর ও নোয়াগ্রাম ইউনিয়নবাসীর যাতায়াতের জন্য খুবই গুরুতপূর্ণ। কিন্তু ঠিকাদারদের গাফিলাতি, অনিয়ম ও দুর্নীতির কারণে এলাকার মানুষ চরম দুর্ভোগে রয়েছেন। মাঠ থেকে ফসল ঘরে তোলাও অনেক কষ্টসাধ্য হয়ে পড়েছে। আমরা এলাকাবাসী এই দুর্ভোগ থেকে মুক্তি চাই।’
এ ব্যাপারে ঠিকাদার কামরুজ্জামান কমর বলেন, কিছু খোয়া খারাপ এসেছে। রাস্তায় বালুর সাথে খোয়ার মিশ্রণ কম হয়েছে। তবে কাজ এখনো শেষ হয়নি। আরো খোয়া দেওয়া হবে। খারাপ খোয়া যা এসেছে। এরপর থেকে ভালো খোয়া দিয়ে কাজ করা হবে।
এলজিইডির লোহাগড়া উপজেলা প্রকৌশলী অভিজিৎ মজুমদার বলেন, ‘আধা কিলোমিটার অংশে খোয়া নিম্নমানের দেওয়া হয়েছে। ওই খোয়া সরিয়ে নিতে বলা হয়েছে। মিশ্রণে খোয়ার পরিমাণও কম আছে। এ নিয়ে যথাযথভাবে কাজ করতে ঠিকাদারকে চিঠি দেওয়া হয়েছে।’
এলজিইডি নড়াইলের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. সুজায়েত হোসেন বলেন, ‘ঠিকাদারকে সিডিউল মেনে কাজ করতে হবে। খারাপ খোয়া সরিয়ে নিয়ে পুনরায় কাজ করার জন্য বলা হয়েছে। প্রয়োজনবোধে চুক্তি বাতিল করে পুনরায় টেন্ডার আহ্বান করা হবে। কিন্তু কাজের মান নিয়ে কোনো ছাড় দেওয়া হবে না।’
এদিকে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগের প্রেক্ষিতে দুদকের একটি প্রতিনিধি দল সড়কটি পরিদর্শন করেছেন। দুদকের যশোর সমন্বিত জেলা কার্যালয়ের উপপরিচালক মো. নাজমুচ্ছায়াদাতের নেতৃত্বে তদন্তকালে অভিযোগের সত্যতা মেলে। পরিদর্শনকালে এলজিইডির নড়াইলের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. সুজায়েত হোসেন, লোহাগড়া উপজেলা প্রকৌশলী অভিজিৎ মজুমদার, জেলা দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটির সাধারণ সম্পাদক কাজী হাফিজুর রহমান, সদস্য আবদুস সাত্তার, মুন্সী আসাদ রহমান উপস্থিত ছিলেন।
পরিদর্শনকালে উপ-পরিচালক মো. নাজমুচ্ছায়াদাত বলেন, ‘দুদুকের হটলাইন ১০৬ নম্বরে অভিযোগের ভিত্তিতে ঢাকা থেকে সড়কটি পরিদর্শনের নির্দেশ দেন। একদম পুরনো খুবই খারাপ ইটের খোয়া দেওয়া হয়েছে। বালির চেয়ে খোয়ার পরিমাণও কম। এগুলো তুলে ফেলতে নিদের্শ দিয়েছি। এ ব্যাপারে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

আরও পড়ুন