হার্ডিভিলের হর্স ফার্ম

আপডেট: 07:09:05 24/12/2020



img

মঈনুস সুলতান

সাউথ কেরোলাইনা অঙ্গরাজ্যে ঢোকার মুখে আমরা রোডসাইডে ঘাসের উপর গাড়িটি পার্ক করি। আমাদের মেয়ে কাজরির সারমেয় সন্তান দুটি, ব্রায়ার ও ফরেস্ট ছুটে গিয়ে গাছের গোড়ায় প্রক্ষালণ সেরে নেয়। আমি ও হলেণ হাত-পায়ের খিল ছোটানোর মওকা পেয়ে খুশি হই। সিগাল-ভাসা আকাশের তলায় উতল হাওয়া বয়ে আনছে নোনাজলের গন্ধ। খানিক দূরে জলাভূমিতে বেজায় দীর্ঘ ঘাসের সায়রে পাথর ফেলে তৈরী করা হয়েছে খটখটে ডাঙ্গা। ওখানে আছে সামুদ্রিক খাবারের মুখরোচক একটি রেস্তোরাঁ। হার্ডিভিল নামক মফস্বল শহর থেকে সামান্য দূরে—যে হর্স ফার্মে আজকে আমরা মেলা দিয়েছি, অই খামারে আগেও বার কয়েক আমরা দিবা-নিশি যাপন করেছি- পাস্তোর্যাল আবেশের শ্যামল সিগ্ধতায় । আসা-যাওয়ার পথে বার কয়েক থেমেছি এ সি-ফুড রেস্তোরাঁয়।
গোটা কতক স্তম্ভের উপর দাঁড়িয়ে থাকা কটেজ-মতো ঘর থেকে কাঠের একটি ঝুলন্ত ডেক চলে গেছে কাঁকড়ায় কিলবিলানো জলাভূমির উপর। ওখানে বসে সারসদের মচ্ছব করে কাঁকড়ার খোল ভাঙ্গার কসরতে চোখ রেখে গ্রীল করা মৎস্যভোজনের স্বাদ এখনো লেগে আছে ঠোঁটেমুখে। উডেন-ডেকের দেয়াল জুড়ে রাখা বিরাট একটি অ্যাকুরিয়াম। খানেওয়ালারা সচরাচর কাচের কৃত্রিম পুকুরে ভাসমান মাছ, কাঁকড়া বা লবস্টারের দিকে ইশারা করে তাদের খাদ্যরুচির ব্যাপারটি জানান। শেফ উর্দ্দীষ্ট মিনটিকে ন্যাট লাগানো বেলচায় পাকড়ে চোখের সামনে কেটে-ছেটে গ্রীলে চাড়ান। পুরো ঘটনাটি—হলেণের জবানীতে—অ্যামস্টারডাম বা মিউনিকের সেক্সশপে কাচের স্ক্রীনের ওপাশ থেকে তাকিয়ে নগ্ন নারীদেহ চুজ্ করার মতো। অই রেস্তোরাঁর উপরতলায় আছে ‘নো টেল রিটায়ারিং কেবিন।’ অর্থাৎ লং ডিসটেন্স ড্রাইভ করনেওয়ালা যাত্রীরা চাইলে গলদাচিংড়ি বা কাঁকড়ার ব্যাপক ভোঁজে আপ্যায়িত হয়ে, অতঃপর ঘণ্টা তিনেক রিটায়ারিং রুমে ইন প্রিন্সিপোল বিশ্রাম করতে পারেন। তবে বুঝদার যাত্রীরা ‘নো টেল ’ শব্দবন্ধের মর্মার্থ জানেন। কোনো নারী বা পুরুষ চাইলে সম কিংবা বিষম-লিঙ্গের সহযাত্রীকে ফুসলিয়ে কেবিনে সম্ভোগ করতে পারেন, এ ঘটনা যে সঙ্গোপন থাকবে, রেস্তোরাঁর ম্যানেজমেন্ট ‘নো টেল’ ঘোষণার মাধ্যমে তার নিশ্চয়তা দিচ্ছেন।
আমরা ফের গাড়িতে চাপি। চড়নদারের বদল হয়। রোডম্যাপ ঘেঁটে হলেণ স্টিয়ারিং হুইলে হাল ধরে। কাজরি আমার পাশের সিটে বসে আইফোনে চোখ রাখে। সিফুড রেস্তোরাঁর সামনের সড়ক দিয়ে ছুটে যাওয়ার সময় চোখে পড়ে বিরাট আকারের একটি ব্যানার, তাতে কার-ড্রাইভারদের ওয়েলকাম করে সরল জবানে বলা হচ্ছে, ঢুকে পড়ুন, কেউ আপনাদের মাস্ক পরা, হাত ধোঁয়া বা সামাজিক দূরত্ব বহাল রাখার কথা বলে বিরক্ত করবেন না। ব্যানারটির কোণায় নো টেল রিটায়ারিং কেবিনের বিজ্ঞাপন, তার তলায় ছোট্ট করে লেখা ফ্রি কনট্রাসেপটিভের কথা। বস্তুটির সংগম ছাড়া অন্য কোনো কাজে ব্যবহারের কথা কখনো শুনিনি।
পিচঢালা সড়কের দীর্ঘ বিস্তার স্মুদলি অতিক্রম করে গাড়িটি চলে আসে ত্রিপথের মোহনায়। এদিকে চলমান যানবাহনের চাপ আছে যৎসামান্য, তাই রাইট-টার্নের অপেক্ষায় থামতে হয় একটু। তখনই চোখে পড়ে সিফুড রেস্তোরাঁর বিশাল আকারের বিলবোর্ডটি। অ্যাক্যুরিয়মের ছবিটি ইলেকট্রনিক কোন কৃৎকৌশলে এমনভাবে আঁকা হয়েছে যে, মনে হয় মাছ, গলদাচিংড়ি ও কাঁকড়াগুলো জলজ গুল্ম ও প্রবালের উপর দিয়ে সাঁতরে বেড়াচ্ছে। বিলবোর্ডে ঝলমলো এই ত্রি-ডি এফেক্টের দিকে তাকিয়ে আমি ভাবি, কাচের কারাগারে বন্দি মাছগুলো তাদের নির্মমভাবে নিহত হওয়ার বিষয়ে অবগত কি?
হঠাৎ করে গাছপালার ব্যাপক ক্যানোপিতে সড়কটি ছায়াচ্ছন্ন হয়ে ওঠে। বুঝতে পারি, হলেণ গ্রামাঞ্চলের ভেতর দিয়ে ড্রাইভ করছে। কেবলমাত্র এক লেনের সড়কে গাড়ির গতি নেমে আসে ঘণ্টায় বিশ থেকে পচিশ মাইলের মধ্যে। জংলা মতো ভুখণ্ডে কিছু দূর পর পর দেখা যায় আইভি লতায় ছাওয়া কিংবা কেয়ারি করা ফুলবাগানসহ সাহেব-সুবোদের বাংলো টাইপের বসতবাড়ি, যা অত্র এলাকায় রেঞ্চ নামে পরিচিত। কোনো কোনো বাড়ির আঙিনায় পড়ে আছে জংধরা ট্র্যাকটার কিংবা ফর্টিজ মডেলের ফোর্ড মোটরকার। আরেকটি টার্ন নিয়ে আমরা ঢুকে পড়ি নুড়িপাথর ছিটানো মেঠোপথে। একটি রেঞ্চ-বাড়ির প্রাঙ্গনে সয়ংক্রিয় সিঁড়ি বেয়ে বিরাট ওকগাছের মগডালের কাছাকাছি পৌঁছে গেছেন রোদপোড়া এক সাহেব। তিনি বৈদ্যুতিক করাত দিয়ে কাটছেন ডাল, তার কামড়ে ধরা পাইপ থেকে উড়ছে ধোঁয়া। এ দৃশ্যপট অতিক্রম করে যাওয়ার পথে পেল্লায় একটি শাখা হুড়মুড় করে ভেঙ্গে পড়ে নিচে।
চলে আসি, ঘাসে-ঘাসালীতে তীব্রভাবে সবুজ হয়ে ওঠা একটি প্রান্তরে। এখানে উড়ে বেড়ানো শুভ্র ডানার হাজার-বিজার প্রজাপতি তৈরি করছে ভিজ্যুয়েল কনট্রাস্ট। গাড়ির গতি কমে চাকা চারটি গড়িয়ে গড়িয়ে চলছে। আকাশ এদিকে এতোই প্রসারিত যে, চক্রাকারে উড়ে বেড়ানো চিলে তৈরী হয়েছে চমৎকার বৃত্ত, চলমান ছায়াও পরফেক্টলি ফুটেছে ঘাসে। মেঠোইঁদুরভূক খেচরদের অন্ধকার কোনো গ্রহকে কেন্দ্র করে ঘুরপাক খেয়ে ভেঙ্গেচুরে খণ্ডিত হওয়া উপগ্রহের মতো দেখায়। হঠাৎ করে মনে হয়, এনালজেসিক ট্যাবলেটের প্রভাবে জ্বর ছেড়ে যাওয়ার মতো শরীর থেকে উপে যাচ্ছে করোনাক্রান্ত স্ট্রেস। চোখের কোণ দিয়ে দেখি, মাঠের সীমান্ত জুড়ে সাদাটে ধুসর পাথর জড়ো করে তৈরী করা হয়েছে দীর্ঘ একটি রকওয়াল। তার ওপারে চরছে সাদাটে-ছাই রঙের চিত্রাপাকরা একটি ঘোড়া।
এবার মেঠোপথটির বা-পাশে ফুটে ওঠে হলুদ রঙের বনফুল। সূর্যমুখির মিনিয়েচার ভার্সনগুলোর কিনার জুড়ে সারি দিয়ে লাগানো হয়েছে ল্যাভেন্ডারের বেগুণি পুষ্পদল। থোকা থোকা হয়ে এখানে ওখানে ফুটেছে শুভ্রপাপড়িতে গোলাপি আভা ছাড়ানো নাম না জানা কিছু ফুল। আমি হরেক বর্ণের ফোটা-ফুলে তৈরী হওয়া প্রাকৃতিক মোজাইকের দিকে চোখ রেখে ভাবি, মেঠোফুলের কিছু প্রজাতির নাম আর জানা হবে না, তার আগেই হয়তো আমার মেয়াদ ফুরাবে।
আমরা পেরিয়ে আসি পর পর কয়েকটি রেঞ্চ টাইপের বসতবাড়ি। একটি বাড়ির ছাদ সারাই করা হচ্ছে। মই বেয়ে উঠা-নামা করছে মানুষজন। ছাদের উপর হামাগুড়ি দিয়ে কেউ কেউ বদলাচ্ছে টাইলস্। কাছেই জোর ভল্যিয়ুমে বাজানো হচ্ছে স্টিরিও, বাতাসে উড়ে বেড়াচ্ছে মেক্সিকান লিরিকের জনপ্রিয় টিউন। সারাই-শ্রমিকদের বাদামি গাত্রবর্ণ দেখে আন্দাজ করি, এরা মেক্সিকো থেকে আগত গেস্ট ওয়ার্কার। এ গোত্রের মানুষজনদের অনেকেই আনডকুমেন্টেড, অর্থাৎ যুক্তরাষ্ট্রে অবাধে ঘোরাফেরার প্রয়োজনীয় কাগজপত্র এদের নেই। মাঝেসাঝে স্থানীয় মিডিয়াতে চাউর হয় এ জনগোষ্ঠির মধ্যে করোনা আউটব্রেকের সংবাদ। এসব নিউজের সচরাচর কোন ফলোআপ থাকে না, তাই বোঝা মুশকিল, অনডকুমেন্টেডরা অসুস্থ হলে হাসপাতালে যায় কিনা? কিংবা মারা গেলে মৃতদের তালিকায় এ পরিসংখ্যানটি যুক্ত হয় কি?
জানালা দিয়ে কব্জি বাড়িয়ে খানিক কসরতে কাজরি পাকড়াও করে ইন্টারন্যাটের সিগনাল। একটি রেডিও চ্যানেলে নিউজকাস্টার বিরস জবানে সংবাদ পড়ে যান। স্কুলখোলার প্রতিবাদে রাজ্যের শত শত শিক্ষক দরখাস্ত পাঠিয়েছেন। সার্জন জেনারেলসহ নানা ধরনের হেলথ প্রফেশন্যালরা সংক্রমণ বৃদ্ধির মোকাবেলায় সমুদ্রসৈকত, পানশালা ও নাইটক্লাব প্রভৃতি বন্ধের আবেদন জানাচ্ছেন, কিন্তু রিপাবলিকান গভর্নর রাজ্যের তাবৎ স্থাপনা খোলা রাখার হার্ডলাইন থেকে সরছেন না একবিন্দু। করোনা-ক্রাইসিসের শুরুয়াত থেকে তিনি সাউথ কেরোলাইনাতে লকডাউনের বিরোধীতা করছেন, প্রচার চালাচ্ছেন যে, মাস্ক ব্যবহার বা সামাজিক দূরত্ব বহাল রাখার সাথে সংক্রমণ হ্রাস পাওয়ার কোন সম্পর্ক নেই। তার সাদাসাপটা বক্তব্য হচ্ছে, স্কুল খুললে কিছু ছেলেমেয়ে অবশ্যই শিকার হবে কোভিডের, কিন্তু তাতে কী, ওরা তো চার-ছয় দিনের চিকিৎসায় ভালো হয়ে উঠবে।
আমি রেডিও চ্যানেল বন্ধ করে দেয়ার ইশারা দিয়ে জানালার কাচ নামাই। খোলামেলা হওয়ায় সিগ্ধ হতে হতে দেখি, গাড়ি একটি পিচ-ফার্মের পাশ দিয়ে মৃদু গতিতে আগাচ্ছে। পুরো মাঠ জুড়ে গাছে গাছে ঝুলছে গুচ্ছ গুচ্ছ সিঁদুরে পিচফল। ফুলতোলা লেসের টপের সাথে সার্কোল স্কার্ট পরা একটি মেয়ে হেঁটে হেঁটে পিচ পেড়ে রাখছে ঝুড়িতে। তার গণ্ডদেশের লালিমা যেন সংক্রমিত হচ্ছে ঝুলন্ত সব পিচফলে। আমরা রোডসাইড স্ট্যান্ডের কাছে মিনিট দুয়েকের জন্য দাঁড়াই। চাকা লাগানো টংঘরে থরে থরে সাজিয়ে রাখা কাগজের ঝুড়িভর্তি তাজা পিচফল। দোকানে বিক্রেতা বলে কেউ নেই, কাজরি নেমে ক্যাশবাক্সে দশ ডলারের নোট রেখে তুলে নেয় ছোট্ট এক ঝুড়ি ফল।
ল্যান্ডস্ক্যাপ পেইন্টারের প্রেরণা হওয়ার মতো দৃশ্যপটের দিকে তন্ময় হয়ে তাকিয়ে ছিলাম। গাড়ির গতি শ্লথ হতে হতে থেমে গেলে খেয়াল করি, আস্তে-ধীরে সড়ক পাড়ি দিচ্ছে তিনটি ছোট্ট ছানাপোনাসহ পেইন্টেড টার্টোল বা খোলে রঙিন নকশা আঁকা চিত্রিত কচ্ছপ। প্রচুর সময় নিয়ে তারা ঘাসের আবডালে অন্তর্হিত হলে, হলেণ বোধ করি লস্ট টাইম কাভার করার জন্য এক্সেলেটরে চাপ দেয়। হুড়মুড়িয়ে পাথরের গ্রাবেল ছিটকিয়ে গাড়িটি এসে পড়ে আমাদের গন্তব্য হর্স-ফার্মের গেটে। কাজরির জোড়া সারমেয়—ব্রায়ার ও ফরেস্ট খামারের খোলামেলা আঙ্গিনায় ছুটে বেড়ানোর এক্সাইটমেন্টে ড্যাশবোর্ডে উপর সামনের পা তুলে দিয়ে একাট্টা হয়ে আওয়াজ দেয়—‘আউও.. ও.. ও.. ও।’
গাড়িতে বসেই কোড পাঞ্চ করে গেট খুলে ফেলা যায়। ব্রায়ার ও ফরেস্টকে সামলানো মুশকিল হয়ে পড়ে। মোরাম বিছানো সড়কে ব্রেক কষে দুয়ার খোলামাত্র ওরা টফকি দিয়ে পড়ে ঘাসে। আমিও নেমে পড়ি। পনেরো একরের প্রসারিত খামারটির এক পাশে কাঠের ফেন্স দিয়ে করা ঘোড়া চরার ক্রাল। তার উপর দিয়ে আকাশ যেন উড়ে যাচ্ছে নিবিড় বনানীর দিকে। আমরা নিঃশ্বাস প্রশ্বাসে অনুভব করি বাতাসের ফ্রেশনেস। কপালে হাত রেখে সুরুজের আলো ফিরিয়ে আমি ফের আকাশের দিকে তাকাই। রোদের তেজ মরে যাচ্ছে, আর ওখানে ফুটে ওঠছে বাঁকানো সেতুটির মতো বর্ণালী এক রঙধনু। ব্রায়ার ও ফরেস্ট বেকরার হয়ে ঘাসে হুটোপুটি করে। তাতে বিরক্ত হয়ে দুটি হরিণ লাজুক মুখে সরে যায় ছায়াচ্ছন্ন ঝোপের কিনারে।
এ খামারে আমরা ছুটি কাটাতে এসেছি বেশ কয়েক বার। এখানে চরে বেড়ানো ঘোড়াগুলোর বংশলতিকা ও দৌড়ে এদের পরফেরমেন্স সম্পর্কে আমরা ওয়াকিবহাল। প্রতিটি ঘোড়াই আমাদের বেশ ভালো করে চেনা। তাই তাদেরকে হ্যালো বলার আগ্রহ নিয়ে জুতা খুলে আমি ঘাসে পা চুবিয়ে আগ বাড়ি। প্রতিটি পদক্ষেপে ধামসানো তৃণগুচ্ছ থেকে শূন্যে উড়াল পাড়ে সূক্ষ্ম ডানার ঘাসফড়িং, যা অত্র এলাকায় ডেমসেল ফ্লাই নামে পরিচিত। প্রাঙ্গণের মাঝ বরাবর দুটি চেনা ঘোড়াকে লকেট করি। এদের একটির নাম জেসপার ও অন্যটি লেইসি। আমি কয়েক পা এগিয়ে যেতেই এরা ঘাড় তুলে আমাকে দেখে, কেশ ঝাঁকিয়ে যেন হ্যালোও বলে। তারপর বিশেষ পাত্তা না দিয়ে তারা ঘাস খুঁটতে ফিরে যায়। বুঝতে পারি, লেইসি ও জেসপার ক্ষুদার্থ, অথবা কোন কারণে অতিথি সম্ভাষণের মুডে নেই। একটু খাজুল হয়ে আমি হর্স-ক্রালের কাঠের ফেন্সের দিকে হাঁটি। অন্য দুটি চেনা ঘোড়া ট্রুপার ও রেনসাম আমাকে দেখতে পেয়ে ঘুরে দাঁড়ায়। আমি ফার্মে এসে পড়াতে ট্রুপার স্পষ্টত খুশি হয়েছে। সে চি হি হি হি আওয়াজ দিয়ে চলে আসে রেলিং এর পাশে, পেছন পেছন রেনসামও। আমি তাদের কাছে গিয়ে কব্জি নাকে ঘঁষে হ্যালো বলি।
ঘোড়াদের সঙ্গে দেখা-সাক্ষাতের পালা শেষ করে চলে আসি ফার্ম-হাউসের সামনে। লনে টেবিল পেতে তাতে রাখা এক জাগ লেমোনেড। আমরা চেয়ার টেনে বসি। দেখা হয় কাজরির বান্ধবী এলার সঙ্গে। লেবুর তরতাজা সৌরভ ছড়ানো পানীয়তে ভাসছে পুদিনার সবুজ পাতা। রিফ্রেসিং এ ড্রিংকসটি সে তৈরী করে রেখেছে। অনেক দিন পর এলার সঙ্গে দেখা হলো। মেয়েটি আর্কিওলজিতে মাস্টার্স করার জন্য চলে গিয়েছিলো স্কটল্যান্ডের গ্লাসগো শহরে। প্রায় বছর খানেক ওখানে বাস করার পর শুরু হয় পেনডেমিকের তুলতবিল। ভিন দেশে থেকে স্কটল্যান্ডে স্টাডি করতে আসা ছাত্রছাত্রীদের নিজ নিজ দেশে ফিরে যাওয়ার নির্দেশ দেয়া হয়। কিন্তু মাত্র দিন চারেক আগে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ইউরোপ থেকে আমেরিকায় আসার তাবৎ ফ্লাইট বাতিল করেছেন। তো অনেক ঝুটঝামেলা ঘাঁটিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে ফিরে আসে এলা। যেখানে বসবাস করছেন তার বয়স্ক পিতামাতা, পৈত্রিক ভিটায় তৎক্ষণাৎ সে যেতে চাচ্ছিলো না। তার সে মুহূর্তে বরং প্রয়োজন ছিলো কোনো নিরিবিলি জায়গায় গিয়ে কয়েক দিন বাস করে করিন্টিন পালন করা। ফার্মের সত্ত্বাধিকারী ডাডলি সাহেব তাকে হর্স ফার্মের আইসোলেশনে বসবাসের ব্যবস্থা করে দেন। মেয়েটি ভালোবাসে ছবি আঁকা, ঘোড়ার সঙ্গও সে পছন্দ করে বিগতভাবে। বর্তমানে স্কটল্যান্ডে ফিরে যাওয়ার কোনো প্রয়োজন নেই, কারণ তার অবশিষ্ট কোর্সগুলো অনলাইন হয়ে গেছে। সুতরাং এখানে বসবাসের বিনিময়ে সে হর্স ফার্মে একটি কাজ জুটিয়ে নিয়েছে। দিনের অনেকটা সময় এলা কাটায় ঘোড়াঘরের চুনকাম করা দেয়ালে ফ্রেস্কো এঁকে। রাতে তার দ্বায়িত্ব হচ্ছে, সিসি টিভির স্ক্রিনে আস্তাবলে ঘোড়ার সতস্ত্র খোপগুলোতে নজর রাখা।
লেমোনেড পান করতে করতে সচেতন হয়ে ওঠি যে, অনেকক্ষণ হয় আমরা চলমান ট্র্যাফিকের কোন সাড়াশব্দ পাচ্ছি না। তবে খোলামেলা প্রাঙ্গনে মাঝেসাঝে হই হই করে বইছে পাতা ওড়ানো হাওয়া। তাতে জুড়াতে জুড়াতে ঈশান কোণ থেকে ভেসে আসা ঘুঘুর কামার্ত ধ্বনি শুনি, আর আমার অন্তঃস্থল ভরে ওঠে দৈনন্দিন জীবনের চাপ ও ঝুঁকি থেকে যাদুবলে নিস্তার পাওয়ার অনুভবে। লেমোনেডের গ্লাসটি শেষ করে উঠে পড়ে এলার সঙ্গে হেঁটে যাই বার্ন বা গোলাঘরের ওপাশে। পাশেই ঘোড়াঘরের চুনকাম করা দেয়াল। ফ্রেক্সোতে ছবিগুলো এখনো ফুটেনি। তবে পেন্সিলের আঁক দিয়ে সে ছয়টি ভিন্ন ভিন্ন ফ্রেমে কী আঁকবে তার অস্পষ্ট নকশা করে রেখেছে। এক জামানায় এ অঞ্চলের পুরোটাই ছিলো নেটিভ আমেরিকান বা আমেরিকার আদিবাসিদের গ্রাম। তাদের উৎখাত করে শ্বেতাঙ্গ সেটলাররা আফ্রিকার কৃষ্ণাঙ্গ ক্রীতদাসদের দিয়ে এ অঞ্চলে শুরু করেছিলো ধানচাষ। এখনো নাকি এদিককার বনাঞ্চলে খোঁজাখুঁজি করলে পাওয়া যায় আদিবাসিদের এরোহেড বা তীরের ধারালো অগ্রভাগ। এলার ফ্রেস্কোটির দুটি ফ্রেমে থাকবে আদিবাসিদের দিনযাপন ও ক্রীতদাসদের মেহনতে গড়ে ওঠা ধানখামারের কাল্পনিক চিত্র।
ফ্রেক্সোর ফ্রেমগুলো এখনো চিত্রিত হয়ে ওঠেনি, ঘোড়াঘরের ফকফকে শাদা দেয়ালে দেখার বিশেষ কিছু নেই, তাই আমরা খামারের প্রান্তিকের দিকে হাঁটি। ‘ইউ মাইট বি ইন্টারেস্টেড টু সি দিস ফিলাডেনড্রন প্লান্ট’ বলে এলা প্রকাণ্ড একটি সিরামিকের টবের সামনে দাঁড়িয়ে পড়ে। গাছটি থেকে তালপাতা শেইপের বেজায় বড় বড় পত্রালি চারদিকে প্রসারিত হয়ে ঝুঁকে পড়েছে, আর কাণ্ড থেকে উঁকি দিয়ে আলোয় মাখামাখি করছে একটি তরতাজা ফুল। আমি ইতিপূর্বে কখনো ফিলাডেনড্রনকে পুষ্পিত হতে দেখিনি। এলার কাছ থেকে জানতে পারি, গাছটি এসেছে ফার্মের সত্ত্বাধিকারী ডাডলি সাহেবের প্রথম স্ত্রী শ্যারোলের কাছ থেকে। তাঁদের মধ্যে ডিভোর্স হয়েছিলো অনেক বছর আগে, তবে নিঃসন্তান শ্যারোলের নাকি মাঝসাঝে দেখখুঁজ করতেন ডাডলি। কোভিডে মহিলা প্রয়াত হওয়ার পর প্রাক্তন স্বামী হিসাবে ডাডলি ফেসবুকে একটি পোস্টিং দেন। তা থেকে জেনেছি যে, ফ্যামিলি রিইউনিওনে নিউ আরলিন্স গিয়েছিলেন শ্যারোল। ওখান থেকে ফিরে অসুস্থ হয়ে পড়েন। হাসপাতালে তাঁর অবস্থা ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠলে তিনি প্রাক্তন স্বামীর সঙ্গে বার দুই ফেস টাইমে কথাও বলেন। বয়োবৃদ্ধ শ্যারোল ভেন্টিলেটার নিতে আপত্তি জানান। তবে সংজ্ঞা হারানোর আগে ডাডলিকে অনুরোধ করেন, তাঁর অত্যন্ত প্রিয় উদ্ভিদ ফিলাডেনড্রনটিকে যেন তিনি দেখভাল করেন। গাছটি নাকি তাঁর অ্যাপার্টমেন্টের বারান্দায় বাস করেছে প্রায় সাড়ে পনেরো বছর। সচরাচর ফিলাডেনড্রনে ফুল ফুটে ষোল বছর পর পর। এলা সেলাফোনে ফুলটির ছবি তুলে। আমি উদ্ভিদটির দিকে তাকিয়ে ভাবি, তরুলতা কি অনুভব করতে পারে স্বজন বিয়োগের ব্যথা কিংবা স্থানান্তরের কষ্ট? এলা নানা এঙ্গোল থেকে তুলে নেয় আরো কয়েকটি আলোকচিত্র। আমি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে অচেনা নারী শ্যারোলের কথা ভাবি। যে ভুবনে গিয়েছেন তিনি, ওখানে ফুলফোটার সংবাদ পাঠানোরও কোন কুদরত থাকেনি!
আমি ও এলা ফের ঘাস ধামসিয়ে হাঁটতে শুরু করি। ফার্মের এ ব্যাকইয়ার্ডে কিছুদূর পর পর গুচ্ছ গুচ্ছ হয়ে ফলেছে গোলাকার অর্নামেন্টাল পাম। বামন প্রজাতির এ সুদর্শন উদ্ভিদগুলোর পাতার সাবুজিক ত্বকে মিশে গিয়ে হাঁটাচলা করছে তীব্র সবুজ কয়েকটি গিরগিটি। একটির সঙ্গে আমার চোখাচখি হতেই সে স্রেফ ফ্রিজ হয়ে পড়ে। স্পষ্টত এরা পত্রালির সবুজিমে মিশে গিয়ে কেমোফ্লাজ করছে, বুঝতে চেষ্টা করি, তবে কি এ ধরনের গিরিগিটিরা নিজেদের লুকাতে চাইছে চিলভাসা আকাশের থ্রেট থেকে?
আমরা চলে আসি ফার্মের ব্যাকগেটের কাছে। এদিকে আছে বেগুনিতে ভাইব্রেন্ট পিংক মিশিয়ে বার্নিশ করা কাঠের ছোট্টমোট্ট একটি কেবিন। জেল্লা ছড়ানো পিংক বর্ণের জন্য বালক-বালিকাদের প্রিয় এ ঘরটির ডাকনাম হচ্ছে        ‘পিংক-মিংক’। আমি কখনো এ ঘরে ঢুকিনি, তবে শুনেছি যে, সিটিংরুমের সোফায় নাকি বিছানো আছে মিংক নামক প্রাণীর তুলতুলে ফারে তৈরী উষ্ণ একখানা লোমশ কম্বল। এ কারণে ডাকনামে পিংক শব্দটির সাথে মিংকও মিশে গেছে। ডাডলি সাহেবের ছেলে-মেয়েরা কিশোর বয়সে হর্স ফার্মে বেড়াতে আসলে এ কেবিনে বাস করতো। মনে হয়, কেবিনটি সারাই করে তাতে আরেক পোচ রঙ লেপা হয়েছে, ছাদের বসানো হয়েছে সোলার প্যানেল। তাই বিকালে আলোয় পিংক-মিংক কেবিনটি ছড়ায় বর্ণালী দ্যুতি।
পাইন বনের দিক থেকে শুভ্রতা ছড়ানো লেসে বোনা প্যারাসোল বা শৌখিন ছাতা মাথায় দিয়ে আমাদের দিকে হেঁটে আসে ভিক্টোরীয়ান যুগের ভিনটেজ গাউন পরা একটি মেয়ে। বেশভূষায় মনে হয়, তরুণীটি যেন জেইন অস্টিনের লেখা কোন নভেলের পৃষ্টা থেকে নেমে এসেছে। তাকে দেখতে পেয়ে আমি এতো আশ্চর্য হই যে, থমকে গিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ি! আমাদের নজর করে সেও থেমে পড়ে হাঁটু ভেঙ্গে গাউনটি একটু খানি তুলে ঝুঁকে কার্টসি করে। থতমত খেয়ে আমি বলে ওঠি,‘হ্যালো দেয়ার, চার্মিং টু মিট ইউ।’ জবাব না দিয়ে সে রূঢ়ভাবে মুখ ঘুরিয়ে নেয়। চকিতে দেখতে পাই, তার চোখ থেকে ছিটকে বেরুচ্ছে বৈদুর্য্যমণির নীলাভ আভার মতো আস্বাভাবিক দ্যুতি। বিড় বিড় করতে করতে সে হেঁটে যায় পিংক-মিংক কেবিনের দিকে। আমি তীব্র কৌতূহল নিয়ে এলার মুখের দিকে তাকাই। হাঁটতে হাঁটতে সে বলে,‘দিস ইজ ক্রিস্টাল। সম্পর্কে ডাডলি সাহেবের ভাগ্নি, কোভিডে মা-বাবা দুজনের মৃত্যু হলে অন্তেষ্ঠিক্রিয়ার দিনে তার মারাত্মক রকমের নার্ভাস ব্রেক ডাউন হয়। এখন ক্রিস্টালের মানসিক অবস্থা ভারসাম্যহীনতার পর্যায়ে পৌঁচেছে। সপ্তাহ খানেক আগে সে বিশ্রাম নিতে ফার্মে এসেছে।’ চলতে চলতে আমি জানতে চাই,‘ সামথিং ভেরি স্ট্রেঞ্জ এলা.. .. কী বলবো, মেয়েটিকে কেন জানি খুব চেনা মনে হচ্ছিলো।’ এলা রহস্যের জট খুলতে সাহায্য করে,‘ ক্রিস্টাল ইজ এ্যান একট্রেস্, মাস্টারপিস প্রগ্রামে সে লিটিল ওয়োম্যান চরিত্রে রেগুলার অভিনয় করতো। তুমি হয়তো সিরিজটি টিভিতে দেখেছো।’  ‘ইয়েস, আই ওয়াচ ওয়ান্স ইন অ্যা হোয়াইল দ্যা মাস্টারপিস.. কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, ক্রিস্টাল কি সব সময় ভিক্টোরীয়ান যুগের নায়িকাদের মতো পোষাক-আশাক পরে থাকে?’ এলার কাছ থেকে জানতে পারি, ‘ক্রিস্টাল শুধু কস্টিউমই পরে না, প্রায়ই বিড় বিড় করে থিয়েটারের ডগলগ উচ্চারণ করে সে ফার্মের সর্বত্র ঘুরে বেড়ায়। মাঝেমাঝে আরো এক্সট্রিম অ্যাবনরম্যাল আচরণ করে আমাদের নার্ভাস করে দেয়।’ আমি কৌতূহল থামাতে পারি না, জানতে চাই,‘হোয়াট আর সাম অব দোজ অ্যাবনরম্যাল বিহেবিয়ারস্?’ একটু ইতস্ততার সাথে সে জানায়,‘ যেমন গেল পরশুর কথা, সন্ধ্যাবেলা ক্রিস্টাল ম্যাগনোলিয়া গাছের তলায় ঝুপসি অন্ধকারে দাঁড়িয়ে প্রথমে তার অন্তর্বাস পোড়ায়, তারপর টপলেস হয়ে কাঁদতে কাঁদতে পোড়াতে শুরু করে আতশবাতি।’
ক্লান্ত লাগছিলো, তাই ফার্ম হাউসের বারান্দায় উঠে রকিং চেয়ারে গা এলিয়ে দেই। কোথায় যেন ঘণ্টা বাজে। হর্স-ক্রালে চরে বেড়ানো ঘোড়াগুলো ফিরে যায় আস্তাবলের নির্দ্দিষ্ট খোপে। এলা খোপে খোপে ঢুকে ম্যামোথ সাইজের ফ্যানগুলো ছেড়ে দিচ্ছে। স্মৃতিতে আবছা হয়ে আসা উপন্যাসের মতো ধীরে ধীরে তাবৎ আলো মুছে গিয়ে সন্ধ্যা নামে। বারান্দার এক কোণে জ্বলে ওঠে সোলার পাওয়ারের মোলায়েম আলো ছড়ানো লণ্ঠন। রাজ্যের হরেক কিসিমের ঝিঁঝি পোকারা তারস্বরে যেন পুরো খামারটির দখল নেয়। আমি চুপচাপ বসে বসে মাত্র কিছু দিন আগে মা-বাবাকে হারানো অভিনেত্রী মেয়েটির কথা ভাবি। আমার সহানুভূতির সঙ্গে যুক্ত হয় তীব্র কৌতূহল।
অন্ধকার একটু গাঢ় হতেই আমরা ক্যাম্পফায়ারের আগুন জ্বালি। এলা চমৎকার একটি পাউরুটি বেক করে রেখেছে। তাতে এক্সট্রা-ভার্জিন অলিভ ওয়েল স্প্রে করে রসুন ও মাৎসারেলা চিজ মিশিয়ে ইতলিয়ান কেতায় ব্রুসকেটা তৈরী করে নিতে কোন সমস্যা হয় না। স্মোকড্ স্যামন মাছের সাথে আগুনের কবোষ্ণ আঁচে পানীয় হিসাবে লেমনচেলোর স্বাদও খুব ভালো লাগে। কাজরি গ্রামক্রেকারের উপর হার্সির চকোলেট বার ও মার্সমেলো মিশিয়ে আগুনে ঝলসে মেল্ট করার উদ্যোগ নেয়। তখনই ঘটনাটা ঘটে। ফার্মের পিছন দিকের আকাশে হরেক বর্ণের ফুলঝুরি ছিটিয়ে তীব্র শব্দে বিষ্ফোরিত হয় আতশবাজি। আস্তাবলের খোপে খোপে ঘোড়াগুলো আতঙ্কে চি হি হি করে আর্তনাদ ছড়ায়।
ভয়ার্ত প্রাণীগুলোকে শান্ত করতে এলা ঘোড়াঘরের দিকে ছুটে যায়। কাজরি বিরক্ত হয়ে বলে,‘ ক্রিস্টালের মাথায় আজ রাতেও আতশবাজী ফোটানোর বাই চাপলো।’ তার কাছ থেকে আমরা মানসিক ভারসাম্য হারানো মেয়েটির কথা আদ্যপান্ত শুনি। ক্রিস্টাল ‘এসিমটোমেটিক’, অর্থাৎ তার শরীরে কোভিডের কোনো আলামত না থাকায় মেয়েটি নিজেও জানতো না যে, সে ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছে। তার বয়োবৃদ্ধ মা-বাবা রিটায়ারিং হোমে বাস করতেন। তাঁরা ভালোবাসতেন সেইলবোটে পাল তুলে সৈকতসংলগ্ন লেগুনে ঘুরে বেড়ানো। তো মা-বাবার পয়ষট্টিতম বিবাহবার্ষিকীতে ক্রিস্টাল চার্লস্টন থেকে ফ্লোরিডার পামবিচ শহরতলীর রিটায়ারিং হোমে ফিরে। সে অতঃপর তার মা-বাবাকে সেইলবোটে করে লেগুনে বেড়াতে নিয়ে যায়। নার্সিংহোমে ফিরে দিন কয়েক পর মা-বাবা দুজনে আক্রান্ত হন কোভিডে। যেহেতু তারা মাস দুয়েক অন্য কারো সঙ্গে দেখা-সাক্ষাৎ করেননি কিংবা অন্য কোথাও বেড়াতে যাননি, ডাক্তার ক্রিস্টালকে টেস্ট করাতে পরামর্শ দেন, তাতে ধরা পড়ে যে সে এসিমটোমেটিকভাবে আক্রান্ত। সপ্তাহ দুয়েক ভুগে পিতা-মাতা দুজনের মৃত্যু হলে, নিকটাত্মীয় হিসাবে ডাডলি সাহেব তাঁদের অর্থাৎ তাঁর বোন ও ভগ্নিপতির অন্তেষ্ঠিক্রিয়ার আয়োজন করেন। অই অনুষ্ঠানে ক্রিস্টালের নার্ভাস ব্রেকডাউন হয়। পরে তার মানসিক অবস্থার অবনতি হলে সাইক্রিয়াটিস্টের তত্ত্বাবধানে চিকিৎসা শুরু হয়। ডাক্তার বিশ্রাম নিতে বলেছেন, সে পরামর্শানুযায়ী ক্রিস্টাল কিছু দিনের জন্য ফার্মে এসেছে। পরিকল্পনা ছিলো, জনশন পরিবারের সকল আত্মীয়স্বজনদের ফার্মে দাওয়াত করে ঘটা করে পয়ষট্টিতম বিবাহবার্ষিকী উদযাপন। ডাডলি সে উৎসবের কথা ভেবে ক্রয় করে রেখেছিলেন নানা রঙের পয়ষট্টিটি আতশবাজী। এগুলো রাখা ছিলো পিংক-মিংক কেবিনে। কিন্তু করোনা-ক্রাইসিসে সপ্তা কয়েকের লকডাউন হলে ফ্যামিলি রিইউনিওনের পরিকল্পনা বাতিল করা হয়। ধারনা করা হচ্ছে যে, ক্রিস্টাল মা-বাবাকে সেইলবোটে করে লেগুনে বেড়াতে না নিয়ে গেলে, তাঁরা হয়তো আরো বছর কয়েক বেঁচেবর্তে থাকতেন। ফার্মে বিশ্রাম নিতে আসার পর পর ডাডলি সাহেব কাজরি ও এলাকে টেলিফোন করে সব কিছু খুলে বলে অনুরোধ করেছেন,‘ পুওর গার্ল, প্লিজ বি কাইন্ড টু হার।’
আমাদের গেস্ট-কেবিনটি ফার্মের বাওয়ান্ডারির বাইরে পাইন বনে। অন্ধকার গাঢ় হয়ে ওঠেছে, তাই আর হাঁটাহাঁটি না করে গল্ফকার্ট চালিয়ে চলে আসি কেবিনে। সিঁড়ি বেয়ে কাঠের মাঁচা মতো ডেকে উঠতেই আমাদের রীতিমতো অবাক হওয়ার পালা! এখানেও টিমটিমিয়ে জ্বলছে সোলার পাওয়ারের লণ্ঠন। তার আলোয় দেখি, ডেক জুড়ে মশারি খাটিয়ে কাজরি তার তলায় দিব্যি বিছানা পেতে রেখেছে।
গ্রীষ্মের কবোষ্ণ আবহাওয়ায় অতঃপর আমরা হামাগুড়ি দিয়ে মশারির ভেতরে ঢুকি। মাথার উপরে লাখ-বিলাখ নক্ষত্র জ্বালিয়ে যেন হাওয়ায় উড়ে যাচ্ছে চেনাজানা ছায়াপথ। পাশ ফিরতেই গোলাপের স্মৃতিবিদুর গন্ধে মুহূর্তে আর্দ্র হয়ে ওঠে আমার আবেগ। ফিসফিসিয়ে হলেণ জানতে চায়, ‘ডু ইউ রিমেমবার.. হোয়াট কান্ট্রি ইউ হ্যাড কলেক্টেড দিস রোজ এসেন্স?’ আমি বুঝতে পারি, এ সৌরভকে কাজরি ‘সারপ্রাইজ’ অভিহিত করে আমাকে আগে থেকে এলার্ট করে দিয়েছে। দূরে কোথায় যেন নেকড়ে কিংবা কায়োটি ডেকে ওঠে। আমরা যৌথভাবে ভ্রমণ করেছি একাধিক দেশ, রোজ এসেন্সও সংগ্রহ করেছি বেশ কয়েক বার নানা জায়গা থেকে। তৎক্ষণাৎ সুগন্ধের উৎসকে ঠিক পিনপয়েন্ট করতে পারি না। কিন্তু এ মেমোরি গেমে হেরে যেতেও ইগোতে বাঁধে। তাই কনসেনট্রেশন নিয়ে ফের বাতাস শুঁকি। নাসারন্দ্র ভরে ওঠে দারুচিনি, লেবুফুল ও মধুর মিশ্রিত মুগ্ধতায়। না, এ এসেন্স আমরা তানজিয়ার্স কিংবা ইস্তামবুল থেকে সংগ্রহ করিনি। আরিজোনা থেকে জোগাড় করা টি-রোজের নির্যাসও ছড়ায় ভিন্ন ধরনের খোশবু। আন্দাজে তীর ছুড়ে বলি, ‘আই গেস্, ইট ইজ ফ্রম বুলগেরিয়া।’ খানিক উল্লসিত হয়ে হলেণ জবাব দেয়, ‘দ্যাটস্ রাইট, কিন্তু অত সহজে তোমাকে ছাড়ছি না, এ্যকজেক্ট লকেশন বলতে হবে।’ আমি বিষ্মরণের দরিয়ায় বৈঠা মেরে সৈকতে পৌঁছার চেষ্টা করি। কিন্তু তীরের নাগাল পাওয়া সহজ হয় না। হলেণ আরো কিছু ক্লু অফার করে বলে,‘ ওয়ারহাউসে রাখা পুরোনে দিনের স্যুটকেস ঘাঁটতে গিয়ে এ রোজ এসেন্স পাওয়া গেছে, সাথে বুলগেরিয়া নিয়ে তোমার হাতে লেখা ডায়েরি ও ছবির এ্যলবাম।’
দেশের নাম আমি সঠিকভাবে বলতে পেরেছি বটে, কিন্তু নির্যাসের সাকিন কোথায়, কোন উপত্যকা থেকে তা জোগাড় করেছিলাম, কিছুতেই মনে পড়ে না। ভাবি- ডায়েরি যখন পাওয়া গেছে, পৃষ্টা উল্টালেই জানা যাবে লকেশন। তখনই করোটিতে ঝন করে ওঠে ‘রোজোবা ডলিনা’ শব্দ দুটি। সাথে সাথে মনে পড়ে, বলকান পাহাড়ের উত্তরে জোড়া নদী বাহিত উপত্যকা রোজোবা ডলিনা, যা পর্যটকদের কাছে রোজ ভ্যালী নামেও পরিচিত, শিশু কাজরিকে পিটে বেবী ক্যারিয়ারে স্ট্র্যাপ দিয়ে বেঁধে নিয়ে আমরা ওখানে বেড়াতে গিয়েছিলাম। একজন বৃদ্ধ গোলাপচাষী কীভাবে পাপড়ি নিংড়িয়ে সংগ্রহ করতে হয় নির্যাস, সে প্রক্রিয়া আমাদের হাতেকলমে দেখিয়ে ছিলেন। ছবিও তুলেছিলাম ভদ্রলোকের। মেমোরি গেমে আমার সফলতার বিবরণ বীরত্বের সাথে দিতে যাই হলেণকে। কিন্তু ততক্ষণে সে ঘুমিয়ে এমন কাদা হয়ে আছে যে, এখন বাঁদাবনে বাঘ ডাকলেও তাকে জাগানো মুশকিল হবে। তো আমি পাশ ফিরে শুই। ঝিঁঝিপোকার শব্দ ছাপিয়ে কানে এসে লাগে জলঝোরার ঝিরিঝিরি আওয়াজ।
ধলপহরের পর পর চোখে আলো লেগে ঘুম ভেঙে যায়। তো আমরা হাঁটতে বেরোই। ফেন্সের কাছে কয়েকটি হরিণ কুয়াশায় শরীর ঢেকে খুঁটে খাচ্ছে ঘাস। চলে আসি চিকেন হাউসের সামনে। একটি মোর্গা অজানা উত্তেজনায় বাঁক দিয়ে ওঠে। কাছেই ম্যাগনেলিয়া গাছের তলায় ভুঁই ফুঁড়ে উঁকিঝুঁকি দিচ্ছে কতগুলো সাদাটে-বাদামি ছত্রাক। ব্রেকফাস্টের দেরি আছে, তাই গাছতলার বেঞ্চটিতে বসি। জবরদস্ত রকমের ঝুঁটিওয়ালা একটি মোরগ জালিতারের কাছে এসে আমার দিকে তাকিয়ে ক্বক ক্বক করে ওঠে। এ ফার্মে যারা বেড়াতে আসেন, তাদের মহলে প্রচলিত একটি জোক মনে পড়ে। মোরগের ঘরটি তৈরী হয়েছে গ্রামীণ গির্জার আদলে, তাই ডাডলিসহ তাঁর সুহৃদদের কেউ কেউ ঘরটিকে অভিহিত করেন ‘চিকেন চার্চ’ নামে। আমার সেলফোনে টেক্সট্ আসে। ডাডলি সাহেবের স্ত্রী মিসেস সিভিল জনশন ম্যাসেজ পাঠিয়েছেন, রাতে ডাডলির জ্বর বেড়েছে, সামান্য শ্বাসকষ্টও শুরু হয়েছে। টেস্ট করিয়েছিলেন, তার রেজাল্ট পজিটিভ এসেছে। সিভিল তাঁকে হাসপাতালে পাঠানোর প্রস্তুতি নিচ্ছেন। একটু সময় ধুন ধরে বসে থাকি। দেখতে দেখতে চোখের সামনে ছত্রাকগুলো ব্যাঙের ছাতার আকৃতি পায়। অতঃপর উঠে পড়ে চলে আসি ফার্ম হাউসে।
অভেন তপ্ত ম্যাফেনের সাথে ফার্ম-ফ্রেশ ডিমপোচ দিয়ে সাদামাটাভাবে আমাদের পারিবারিক ব্র্যাকফাস্ট বেশ ভালোই জমে। চা এর পেয়ালায় চুমুক দেই, হলেণ সেলফোনের স্ক্রীনে ফুটে ওঠা নিউজফিডটি দেখায়। আমরা যখন ঘুমে সম্বিতহারা, তখন এ দেশে ভাইরাসে মৃতের সংখ্যা দুই লক্ষের কৌটা ছাড়িয়েছে। আক্রান্তের সংখ্যাও অতিক্রম করেছে পঞ্চাশ লক্ষ। খিন্ন মনে হাঁটতে বেরোই। দেখি, হর্স ক্রালে চরছে ঘোড়াগুলো। কাজরি ঘুরে ঘুরে ফুলে ফুলে বসা প্রজাপতির ছবি তুলছে। কেন জানি অবসন্ন লাগে, তাই ফিরে আসি ফার্ম হাউসের বারান্দায়। দোলনায় চুপচাপ বসে দেখি, গোল্ডেন শ্যাওয়ারের লতানো কুঞ্জে ডানার ক্রমাগত ঘূর্ণনে ঝি ঝি শব্দ তুলে উড়ছে ছোট্ট ছোট্ট হামিংবার্ড। খামারের সর্বজন প্রিয় ঘোটকী জিপসি খুরের খটখট শব্দ তুলে চলে আসে করিডরে। তার পেছন পেছন তিন মাসের অশ্ব-শিশু ডিবা। জিপসি দাঁড়িয়ে পড়ে লেহন করে ছোট্ট ডিবার শরীর। আমি দোলনায় বসে বসে আমাদের ভাইরাস নিয়ন্ত্রিত নিয়তির কথা ভাবি। মনে হয়, আজ ভোরে সংক্রমিত হয়েছেন কয়েক হাজার মানুষ, মৃত্যুও হয়েছে শতাধিকের। একটি ভাবনা আমার করোটিতে ঘুরপাক করে, ঠিক বুঝতে পারি না, আর কত দিন সপরিবারে আমি ভাইরাস-মুক্ত থাকতে পারবো?
[বাংলা ট্রিবিউন থেকে]