৭ ডিসেম্বর সাতক্ষীরা মুক্ত দিবস

আপডেট: 07:32:58 06/12/2019



img

আব্দুস সামাদ, সাতক্ষীরা : আজ ৭ ডিসেম্বর। পাঞ্জাবি এসডিওকে গ্রেফতার আর পাকিস্তানি পতাকায় আগুন ও মাতৃভূমি বাংলাদেশের মানচিত্রখচিত পতাকা উড্ডয়নের মধ্য দিয়ে শুরু হওয়া মুক্তিযুদ্ধের প্রথম সম্মুখযুদ্ধ ভোমরা যুদ্ধের সফলতার সাহস নিয়ে অগ্রসর দামাল ছেলেরা সাতক্ষীরাকে শত্রুমুক্ত করেছিল এদিন।
নয়মাসের বীরোচিত লড়াইয়ে ১৬টি যুদ্ধ জয়ের পর এদিন সাতক্ষীরার মাটিতে মুক্তিযোদ্ধারা ফিরে আসতেই পিছু হটে যায় পাকিস্তানি বাহিনী। মুক্তিযোদ্ধারা ঘিরে ফেলে সাতক্ষীরার ডাকবাংলোয় ঘাঁটি করা জঙ্গি সেনাদের। বীর মুক্তিযোদ্ধা মুহিত খান দুলুর নেতৃত্বে ধুলিহর বেজেরডাঙ্গা থেকে একটি দল এবং ক্যাপটেন হুদা ও আবদুল্লাহর নেতৃত্বে আরো দুটি মুক্তিযোদ্ধা দলের ত্রিমুখী আক্রমণের মুখে শত্রু বাহিনী বেনেরপোতা ও বেত্রাবতী ব্রিজ ডিনামাইট দিয়ে উড়িয়ে দিয়ে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে পিছু হটে যায়। বীর যোদ্ধারা সাতক্ষীরা থানা ভবনে বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করে সাতক্ষীরাকে মুক্ত হিসেবে ঘোষণা দেন।
আজ ৪৮ বছর পর আবার নানা আয়োজন ও মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিচারণের মধ্য দিয়ে পালিত হবে সাতক্ষীরা মুক্ত দিবস।
১৯৭১ সালের এই দিনে সাতক্ষীরার দামাল ছেলেরা ভারতের সীমানা পেরিয়ে থ্রি নট থ্রি আর এসএলআরের ফাঁকা গুলি ছুড়তে ছুড়তে সাতক্ষীরা শহরে প্রবেশ করেন। ওড়ানো হয় স্বাধীন বাংলার লাল-সবুজের পতাকা। সন্তান হারানোর বেদনা ভুলে সেদিন মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে রাস্তায় নেমে আসেন মুক্তিপাগল জনতা।
মুক্তিযোদ্ধারা জানান, ১৯৭১ সালের ২ মার্চ সাতক্ষীরা শহরে পাকিস্তানবিরোধী মিছিলে রাজাকাররা গুলি করে হত্যা করে শহীদ আব্দুর রাজ্জাককে। আর এখান থেকে শুরু হয় সাতক্ষীরার দামাল ছেলেদের মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেওয়া। মুক্তিযুদ্ধের খরচাদি বহনের জন্য সাতক্ষীরা ট্রেজারি থেকে অস্ত্র আর ন্যাশনাল ব্যাংক থেকে অলংকার, টাকা-পয়সা লুটের মধ্য দিয়ে শুরু হয় মুক্তির সংগ্রাম।
অষ্টম ও নবম সেক্টরের অধীনে ভারতের বিভিন্ন এলাকায় ট্রেনিং শেষে ২৭ মে সাতক্ষীরার ভোমরা সীমান্তে প্রথম সম্মুখযুদ্ধে অবতীর্ণ হন মুক্তিযোদ্ধারা। সেই যুদ্ধে পাক সেনাদের দুই শতাধিক সৈন্য নিহত হয়। ১৭ ঘণ্টাব্যাপী যুদ্ধে শহীদ হন তিনজন মুক্তিযোদ্ধা। আহত হন আরো দুইজন।
এরপর থেমে থেমে চলতে থাকে সাতক্ষীরার বিভিন্ন এলাকায় মুক্তিযোদ্ধাদের গুপ্ত হামলা। এসব যুদ্ধের মধ্যে ভোমরার যুদ্ধ, টাউন শ্রীপুর যুদ্ধ, বৈকারী যুদ্ধ, খানজিয়া যুদ্ধ উলে¬খযোগ্য। এ সব যুদ্ধে শহীদ হন ৩৩ জন মুক্তিযোদ্ধা। লাইটের আলোয় অসুবিধা হওয়ায় ৩০ নভেম্বর টাইম বোমা দিয়ে শহরের কেন্দ্রবিন্দুতে অবস্থিত পাওয়ার হাউস উড়িয়ে দিয়ে মুক্তিযোদ্ধারা ভীত-সন্ত্রস্ত করে ফেলেন পাক সেনাদের। রাতের আঁধারে বেড়ে যায় গুপ্ত হামলা। পিছু হটতে শুরু করে পাক সেনারা। ৬ ডিসেম্বর রাতে মুক্তিযোদ্ধাদের হামলায় টিকতে না পেরে বাঁকাল, কদমতলা ও বেনেরপোতা ব্রিজ উড়িয়ে দিয়ে পাক বাহিনী সাতক্ষীরা থেকে পালিয়ে যায়। ৭ ডিসেম্বর জয়ের উন্মাদনায় মেতে ওঠেন সাতক্ষীরার দামাল ছেলেরা।

যারা শহীদ হন
মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে শত্রুদের গুলিতে সাতক্ষীরার যে সকল বীর সন্তান শহীদ হন তারা হলেন, আব্দুর রাজ্জাক, কাজল, খোকন, নাজমুল, হাফিজউদ্দিন, নুর মোহাম্মদ, আবু বকর, ইমদাদুল হক, জাকারিয়া, শাহাদাত হোসেন, আব্দুর রহমান, আমিনউদ্দিন গাজী, আবুল কালাম আজাদ, সুশীলকুমার, লোকমান হোসেন, আব্দুল ওহাব, দাউদ আলী, সামছুদ্দোহা খান, মুনসুর আলী, রুহুল আমীন, জবেদ আলী, শেখ হারুন অর রশিদ প্রমুখ।
মুক্তিযোদ্ধাদের অভিযোগ, স্বাধীনতার ৪৭ বছর পেরিয়ে গেলেও সাতক্ষীরার বধ্যভূমি ও গণকবরগুলো সংরক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। একই সঙ্গে সাতক্ষীরা কালেক্টরেট চত্বরে জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে নির্মিত শহীদ স্মৃতিস্তম্ভে ‘রাজাকারের নাম উল্লেখ থাকায়’ তা উদ্বোধন করা হয়নি। সেখানে শ্রদ্ধা জানাতে যান না মুক্তিযোদ্ধারা। অযত্ন আর অবহেলায় হারিয়ে যেতে বসেছে বধ্যভূমি ও গণকবরের স্মৃতিচিহ্ন। এগুলো যথাযথ সংরক্ষণের অভাবে হারিয়ে যাচ্ছে ধীরে ধীরে। তাই বধ্যভূমি ও গণকবরের স্মৃতি ধরে রাখার জন্য মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণের জন্য সরকারের কাছে জোর দাবি জানিয়েছেন সাতক্ষীরার মুক্তিযোদ্ধারা।
সাতক্ষীরা জেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার মোশারফ হোসেন মশু বলেন, প্রতিবছর ৭ ডিসেম্বর জেলা মুক্তিযোদ্ধা ইউনিটের আয়োজনের যথাযোগ্য মর্যাদায় দিনটি পালন করা হয়। তিনি সাতক্ষীরার বধ্যভূমি ও গণকবরগুলো সংরক্ষণের দাবি জানান সরকারের কাছে। একই সঙ্গে সাতক্ষীরা কালেক্টরেট চত্বরে জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে নির্মিত শহীদ স্মৃতিস্তম্ভে রাজাকারদের নাম মুছে সেটি উদ্বোধনের দাবি জানান।
সাতক্ষীরার জেলা প্রশাসক এস এম মোস্তফা কামাল জানান, সাতক্ষীরার বধ্যভূমিগুলো সংরক্ষণে উদ্যোগ নেওয়া হবে। ইতোমধ্যে বধ্যভূমিগুলো চিহ্নিত করা হয়েছে। মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে এলজিইডি ও গণপূর্ত বিভাগ সংরক্ষণের কাজ বাস্তবায়ন করছে। আর কালেক্টরেট চত্বরের শহীদ স্মৃতিস্মম্ভ নিয়ে আলাপ আলোচনা চলছে। সবাইকে নিয়ে বিদ্যমান বির্তক নিরসন করে তা অচিরেই উদ্বোধনের আশ্বাস দেন জেলা প্রশাসক।