৯৫-তেও বয়স্ক হননি হাছিনা!

আপডেট: 04:00:16 02/05/2020



img

আনোয়ার হোসেন, মণিরামপুর (যশোর) : জন্মসনদ অনুযায়ী বয়স ৮৮ বছর। কিন্তু নিজের হিসেবে হাছিনা বেগমের বয়স হয় ৯৫। এই বয়সেও ভাতা জোটেনি তার কপালে। যদিও সরকারি নিয়মে ৬৩ বছর বয়সেই ভাতা পাওয়ার কথা ছিল হাছিনার।
ভাতার জন্য স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের দুয়ারে দুয়ারে বহুবার ঘুরেছেন হাছিনা বেগম। প্রতিবারই তাদের লোভের কাছে হেরেছেন তিনি। স্বামীহারা এই নারী একাধারে বৃদ্ধা, বিধবা ও দৃষ্টি প্রতিবন্ধী। তিন ধরনের ভাতা পাওয়ার যোগ্য তিনি। তারপরও নিজের জন্য জোটাতে পারেননি একটি ভাতার কার্ড। এখন ‘বোঝা’ হয়ে পড়ে আছেন ছোট ছেলে ভ্যানচালক রফিকুল ইসলামের ঘাড়ে।
হাছিনা বেগম যশোরের মণিরামপুর উপজেলার সরসকাঠি গ্রামের মৃত মালেক গাজীর স্ত্রী। ঠিক কত বছর আগে স্বামীকে হারিয়েছেন সেটাও মনে করতে পারেন না এই নারী। স্বামী চলে যাওয়ার পর থেকেই অন্যের বাড়িতে কাজ করতেন তিনি। পরে বড় ছেলে ভ্যানচালক আব্দুল খালেকের কাছে থেকেছেন কিছুদিন। কয়েক বছর আগে বড় ছেলে অসুস্থ হয়ে মারা যান। তার একবছর আগে ক্যানসারে আক্রান্ত হয়ে মারা যান আব্দুল খালেকের স্ত্রী হাজিরা বেগম। তারপর থেকে নানা রোগব্যাধি নিয়ে ছোট ছেলের সংসারে আছেন হাছিনা বেগম।
অশীতিপর এই নারীর ছোট ছেলে রফিকুল ইসলামের বয়স ৬৩ বছর। তিনিও ইতিমধ্যে ভাতা পাওয়ার যোগ্য হয়েছেন। এই বয়সেও ভ্যান চালিয়ে কোনো রকমে স্ত্রী সন্তানদের মুখে আহার দিতেই কষ্ট হয় তার। বৃদ্ধা মাকেই বা তিনি টানবেন কী করে!
করোনাভাইরাসের কারণে গত দেড়মাস ধরে ঠিকমতো ভ্যান টানতে পারেন না রফিকুল। বৃদ্ধা মা ও স্ত্রী সন্তানদের নিয়ে নিদারুণ কষ্টে দিন কাটলেও সরকারি কোনো ত্রাণ জোটেনি তার ভাগ্যে।
হাছিনা বেগম অভিযোগ করে বলেন, ‘ছেলেরা গরিব হওয়ায় এর ওর বাড়ি কাজ করে খাতাম। চোখ নষ্ট হওয়ার পর এখন আর কাজ করতি পারিনে। আমাদের ওয়ার্ডের মহিলা মেম্বর সুফিয়া বেগমের কাছে গিইলাম। মেম্বর তিন হাজার টাকা চাইলো; দিতি পারিনি। আমি গরিব মানুষ; টাকা পাবো কনে?’
‘রোহিতা ইউনিয়ন পরিষদের মাঠে কয়দিন আগে ডাকিলো। যাইনি। অনেক হাঁটিছি ; কিছু পাইনি। এখন আর হাঁটুতে বল পাইনে,’ বলেন বৃদ্ধা।
তবে অভিযুক্ত সংরক্ষিত ওয়ার্ড (৭, ৮ ও ৯) মেম্বর সুফিয়া বেগম বলেন, ‘আমি ওনাকে চিনি না। আমি গরিব হতে পারি, কিন্তু টাকার প্রতি আমার লোভ কম।’

হাছিনা বেগমের পোতা (দৌহিত্র) শাহিনুর হোসেন বলেন, ‘দাদি এখন খুব অসুস্থ। আব্বার মতো আমরা দুই ভাইও ভ্যান চালাই। নিজেদের চলা কষ্ট। দাদিরে দেখব কী করে?’
শাহিনুর আক্ষেপ করে বলেন, ‘দাদির জন্য অনেকের হাত-পা ধরিছি। কাজ হোইনি।’
হাছিনা বেগমের মতো সরসকাঠি-কাশিমপুর গ্রামে অনেক বয়স্ক নারী পুরুষ ভাতা পাওয়ার যোগ্য হলেও তারা বঞ্চিত হচ্ছেন। যদিও ওই ওয়ার্ডের বর্তমান ইউপি সদস্য আমিনুল হাসান শিল্পীর মায়ের নামে ভাতার কার্ড রয়েছে বলে জানান স্থানীয়রা।
রোহিতা ইউনিয়নে দায়িত্বপ্রাপ্ত সমাজসেবা কর্মী সাধনা অধিকারী বলেন, ‘আমি তো ওইভাবে খোঁজ নিইনে। চেয়ারম্যান-মেম্বররা যে তালিকা দেয়; তা নিয়ে কাজ করি।’
স্থানীয় ইউপি সদস্য আমিনুল হাসান শিল্পী বলেন, ‘নতুন করে যাচাই-বাছাইতে আমার ওয়ার্ডের বয়স্ক ভাতার জন্য আটজনের আবেদন জমা পড়েছে। কিন্তু হাছিনা বেগমের নাম দেওয়া হয়নি। তখন উনি বাড়ি ছিলেন না।’
মেম্বার বলেন, ‘আমার হাতে মৃত ব্যক্তির একটা কার্ড আছে। ওটা হাছিনা বেগমকে দেবো।’
নিজের মায়ের নামে বয়স্কভাতার কার্ডের ব্যাপারে মেম্বার বলেন, ‘আমি মেম্বার হওয়ার অনেক আগে মার নামের কার্ডটি হয়েছে।’
জানতে চাইলে মণিরামপুর উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা মো. রোকনুজ্জামান বলেন, ‘আমি বিষয়টি জেনেছি। দ্রুত ব্যবস্থা নিচ্ছি।’