‘আমি রুলিং পার্টির প্রেসিডেন্ট, দেখে নেব’

আপডেট: 02:24:58 28/01/2021



img

মৌসুমী নিলু, নড়াইল : নড়াইল জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি অ্যাডভোকেট সুবাসচন্দ্র বোসের বিরুদ্ধে সংবাদ সম্মেলন করে ভয়ভীতি ও হুমকি ধামকির অভিযোগ আনা হয়েছে।
অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে, অ্যাডভোকেট সুবাস বোস বলেছেন, তিনি রুলিং পার্টির তিন তিন বারের জেলা কমিটির প্রেসিডেন্ট। এতো বড় সাহস- তার বিরুদ্ধে বাংলাদেশ বার কাউন্সিলে দরখাস্ত দেয়। আবার সংবাদ সম্মেলনের কথা বলে। দেখে নেব; মোটা টাকায় মানহানি মামলা করবো।
বৃহস্পতিবার (২৮ জানুয়ারি) সংবাদ সম্মেলন আহ্বান করে সেখানে এমন অভিযোগ করেন নড়াইল শহরের কুড়িগ্রামের সুলতান আলী খন্দকার ও সামছুল আলম নামে দুই ব্যক্তি।
বেলা ১১টায় সুলতান আলী খন্দকারের বাড়িতে এ সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। এ সময় উপস্থিত ছিলেন সৈয়দ খন্দকার, রিন্টু খন্দকার, হাজেরা বেগম, জোসনা বেগম প্রমুখ।
সুলতান আলী খন্দকার লিখিত বক্তব্যে আরো বলেন, 'কুড়িগ্রাম মৌজার ২৭০ ও অন্য আরো খতিয়ানের ৪২০, ৪২১, ৪২২, ৪২৩, ৪২৪, ৪২৫, ৪২৯, ৪৩০, ৪৩১, ৪৩২ দাগের পাঁচ একর ৬০ শতক জমি আমাদের তিন শরিকের। এ জমি নিয়ে গণপূর্ত অফিসের ইমারত বিভাগের সাথে মামলা চলছে। আমরা মামলায় আইনজীবী হিসাবে জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি অ্যাডভোকেট সুবাসচন্দ্র বোসকে নিয়োজিত করি। দেওয়ানি ৪৭৯/১৯৮০ নম্বর মামলাটি চলমান না থাকায় সেটি খারিজ হয়।'
তিনি আরো বলেন, ''যেহেতু এই মামলায় আমাদের পূর্ববর্তী শরিকরা সুবাস বোসকে আইনজীবী হিসেবে রেখেছিলেন। সেহেতু পরবর্তীতে আমরা স্বত্বের মোকদ্দমা করার জন্য ১৯৯৯ সালে অ্যাডভোকেট সুবাসচন্দ্র বোসকে আইনজীবী হিসেবে থাকার জন্য অনুরোধ করি এবং ফাইলপত্র দিয়ে আসি। তিনি আমাদের ২-৩ মাস ধরে 'আজ করছি, কাল করছি' বলে ঘুরাতে থাকেন। শেষ পর্যন্ত সুবাস বোস আমাদের আইনজীবী হিসেবে থাকেননি। পরবর্তীতে আমরা ১৯৯৯ সালে অ্যাডভোকেট রবিউল ইসলামকে আইনজীবী নিয়োগ করে স্বত্বের মোকদ্দমা করি। যার মামলা নম্বর- ৮০/৯৯। এই মামলায় রায় আমাদের পক্ষে আসে অর্থাৎ আমরা ডিক্রিপ্রাপ্ত হই। তখন অ্যাডভোকেট সুবাস বোস বলেন, 'এই জমির অনেক মূল্য, প্রশাসনের নজরে আছে। এইভাবে সহজে তোমরা জমি পাবে না। যদি ওই জমির এক তৃতীয়াংশ ছেড়ে দাও তাহলে আমি চেষ্টা করে তোমাদের জমি পাইয়ে দেবো।' কিন্তু আমরা জমি দিতে রাজি হইনি।''
'এরপর আকস্মিকভাবে গণপূর্ত অফিসের ইমারত বিভাগ উচ্চ আদালতে আপিল (নম্বর-১৪৫/২০০১) করে। তখন অ্যাডভোকেট সুবাস বোস উক্ত মামলায় আমাদের বিপক্ষের আইনজীবী হিসেবে দায়িত্ব নেন। আপিল করায় উক্ত জমির বিষয়ে রিমান্ড হিসাবে নিম্ন আদালতে (সিনিয়র অ্যাসিস্ট্যান্ট জজ কোর্ট, মামলা নম্বর ১৬৫/২০১৬) পুনর্বিবেচনায় যায়।'
সুলতান আলী খন্দকার আরো বলেন, 'অ্যাডভোকেট সুবাস বোস আমাদের পক্ষের আইনজীবী থাকাকালে মামলার খুটিনাটি, গোপন তথ্য, জরুরি কাগজ দলিলপত্র তার কাছে ছিল। বিধায় সকল গোপন ও প্রয়োজনীয় তথ্য তিনি জানেন। তাই আমরা ক্ষতিগ্রস্ত হই। বার বার অনুরোধ করা সত্ত্বেও তিনি বিবাদী পক্ষ থেকে সরে আসেননি। যে কারণে ২০১৯ সালের ২৮ নভেম্বর বিষয়টির সুষ্ঠু সমাধান বা বিচারের জন্য আমি বাংলাদেশ বার কাউন্সিলে আবেদন করি। যার পরিপেক্ষিতে বাংলাদেশ বার কাউন্সিল অ্যাডভোকেট সুবাস বোসকে শো-কজ করে। বার কাউন্সিলের নোটিস পেয়ে তিনি ক্ষিপ্ত হন এবং আমাকে হুমকি-ধামকি দিয়ে যাচ্ছেন। এমনকি আমার আত্বীয়স্বজনকে ও নানাভাবে ভয়ভীতি দেখাচ্ছেন। তিনি জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি হওয়ায় প্রভাবশালী ও ক্ষমতাধর। এ অবস্থায় আমি আমার পরিবার পরিজন নিয়ে নিরাপত্তাাহীনতায় ভুগছি।'
তিনি বলেন, 'একজন খ্যাতনামা আইনজীবী যদি এ ধরনের আচরণ করেন তাহলে সাধারণ মানুষ কোন বিশ্বাসে আইনজীবী নিয়োগ করবে? আমরা ক্ষতিগ্রন্ত হয়েছি সেহেতু অন্যরা যাতে এরকম আইনজীবী দ্বারা ক্ষতিগ্রস্ত না হয় সেজন্যই প্রতিবাদস্বরূপ আজকের এই সম্মেলন করা।'
এই বিষয়ে জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি অ্যাডভোকেট সুবাসচন্দ্র বোসের কাছে জানতে চাইলে, তিনি প্রথমে বিষয়টি অস্বীকার করেন। পরে তিনি বলেন, 'আমি কোনো জমি চাইনি। অনেকদিন আগের কথা, আমার স্মরণে নেই।'
বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের শো-কজের বিষয়ে সুবাস বোস বলেন, 'সাংবাদিকদের কাছে বলার কিছু নেই। আমি বার কাউন্সিলের সাথে বুঝবো। জবাব দেওয়া না দেওয়া- সেটা এটা আমার ব্যাপার।'
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন সিনিয়র রাজনীতিক ও আইনজীবী বলেন, বার কাউন্সিলের আইনে আছে বাদী পক্ষের আইনজীবী বিবাদী পক্ষের আইনজীবী হতে পারবেন না। যদি হয় সেটা বেআইনি। তবে অ্যাডভোকেট সুবাসচন্দ্র বোস এ ধরনের কাজ অহরহ করে থাকেন। যার প্রমাণ তিনি হাটবাড়িয়া জমিদারদের জমি ভূমিদস্যুদের পাইয়ে দিতে চেষ্টা করে ব্যর্থ হন। নড়াইল সরকারি বালক বিদ্যালয়ের সামনের রাস্তার দক্ষিণ পাশের জমির মামলায় তার নিজস্ব শর্তে মামলা পরিচালনা করে জমির মালিক হয়ে গেছেন। অ্যাডভোকেট সুবাস বোস নীতি-নৈতিকতা বিসর্জন দিয়ে পেশার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করে টাকার পেছেন ছোটেন। এভাবে অঢেল সম্পত্তির মালিক হয়েছেন এবং পাশের একটি দেশে পাচারও করছেন। শোনা যায়, সেখানে তার একাধিক বাড়ি আছে। একজন প্রবীণ আইনজীবীর কাছে এমনটা আশা করা যায় না।
এ বিষয়ে নড়াইল জেলা আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট উত্তমকুমার ঘোষ ব কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
নড়াইল জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি অ্যাডভোকেট হেমায়েতুল্লাহ হিরু বলেন, 'এক মামলায় একই আইনজীবীর বাদী ও বিবাদী না হওয়ার ব্যাপারে বার কাউন্সিল রুলস অ্যান্ড অর্ডার ও মহামান্য উচ্চ আদালতের সিদ্ধান্ত আছে। যেখানে প্রফেশনাল মিসকন্ডাক্ট বিষয়ে বিস্তারিত উল্লেখ আছে। বার কাউন্সিল অ্যাডভোকেট সুবাসচন্দ্র বোসের কাছে বিষয়টি সম্পর্কে জানতে চেয়েছে বলে আমি জানি।'

আরও পড়ুন