‘উঠোনে জোয়ার-ভাটা চলতিছে, কিসির ঈদ?’

আপডেট: 03:01:53 01/08/2020



img
img

আসাদুজ্জামান সরদার, সাতক্ষীরা : ‘তিন বিলা তিন মুঠো খাবার জোটে না, আমাগির কিসির ঈদ? ঘূর্ণিঝড় আম্পানে ঘরের টিনের চাল উড়িয়ে নিয়ে যায়। পরে কপোতাক্ষ নদীর কুড়িকাহুনিয়ার বাঁধ ভাঙি আমাদের ঘর-বাড়ি সব ভাসায় নিয়ে গেছে। প্রথম কয়দিন রাস্তার ওপর গরু-ছাগলের সাথে থাকতাম। দুই মাসের বেশি সময় পার হুয়ি গেছে। এখনো বাড়ির উঠোনে জোয়ার-ভাটা চলতিছে। থাকার জায়গা নেই। অসুস্থ স্বামী আর দুই ছেলেকে নিয়ে কুড়িকাহুনিয়া মহিলা মাদরাসায় থাকি। রোজার মাসে ফিতরার কিছু টাকা পাইলাম। সেইডে দিয়ে অসুস্থ স্বামীর চিকিৎসা করাইলাম। রোজার ঈদে কোনো কিছু জুটিনি। খাওয়া হয় না ঠিকমতো। কোনো বেলায় কিছু জুটলি খাই, না জুটলি পানি খেয়ে দিন কাটায়ে দিই। এই ঈদেও মনে হয় না কিছু জোটবে। এই এলাকার অধিকাংশ মানুষ পানিতে ভাসতিছে। অনেক চিষ্টা করিও বাঁধ দিতি পারিনি। আমাদের আবার কিসের ঈদে। আমরা এতদিন ধরি পানিতে ভাসতিছ। আমাগির কষ্ট কেউ দেখতি পায় না। বাথরুমে পর্যন্ত যাবার জায়গা নেই। বাথরুম করার জন্যি সন্দি পর্যন্ত অপেক্ষা করতি হয়। আপনারা ঈদ করেন...’ কথাগুলো একদমে বলতে বলতে হাউমাউ করে কাঁদতে শুরু করলেন আশাশুনির প্রতাপনগরের কুড়িকাহুনিয়া এলাকার মঞ্জিলা খাতুন (৪৫)।
শুধু মঞ্জিলা নন, তার মতো একই অবস্থা অনেক পরিবারের।
আশাশুনির শ্রীউলা ইউনিয়নের মাড়িয়ালা গ্রামের দিনমজুর জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ‘চারিদিক পানি ছিল। সে কারণে রুজার ঈদের নামাজ পড়তি পারিনি। এবারো পড়তি পারবো কিনা জানিনে। দুই মাসের বেশি সুময় (সময়) ধরি আমরা পানিতি ভাসতিছি। বাড়িঘর কিছু নেই। অনেক মানুষ এলাকা ছাড়ি চলি যাতিছে। ঈদ তো আমাগির জন্য না। চেয়ারম্যান মেম্বরা অল্প কিছু চাল-ডাল দেয়। তাই খায়ি বাঁচি আছি। চারিদিক পানিতে ডুবুনে, আবার করোনায় কাম-কাজ কিছু নেই। খায়ি না খায়ি কোনোরকম দিন কাটি যাতিছে। আমরা যে কী অসহায় জীবন যাপন করতিছ তা বলার ভাষা নেই। আগে কুরবানি ঈদে গরুতে ভাগি হতাম। এবার ঈদের সেমাই কিনতে পারিনি। খাওয়া হচ্ছে না ঠিকমতো ছেলে-মেয়েগের কিছু কিনে দেবো কী করি?’
শ্যামনগর উপকূলের গাবুরা, পদ্মপুকুর এবং বুড়িগোয়ালিনীর মানুষের মধ্যে ঈদের আনন্দ নেই। দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলের অধিকাংশ মানুষ সুন্দরবনের ওপর নির্ভরশীল। জুলাই থেকে বনে যাওয়া নিষেধ।
শ্যামনগর উপকূলের সাইদুল গাজী, গাজী বাদশাসহ গাবুরা ইউনিয়নের বেশ কয়েকজন জেলে-বাওয়ালি বলেন, তারা পানিবন্দি এলাকার মানুষ। এবার ঈদ করতে পারছেন না। গত বছর অনেকে কুরবানি দিয়েছেন। তবে এ বছর তাদের অধিকাংশই কুরবানিতে অংশ নিতে পারছেন না।
গাবুরা ইউনিয়নের আবুল হাসান বলেন, ‘সাতক্ষীরা উপকূলের মানুষের আয়ের প্রধান উৎস বাগদা, গলদা, মাছ, কাঁকড়া ইত্যাদি। সেটিও বন্ধ। পানিবন্দি উপকূলে শিশুদের এই ঈদে নতুন জামা কিনে দেওয়ার মতো সক্ষমতা নেই।’
গাবুরা নয় নম্বর সোরা এলাকার বেশ কিছু জেলে বলেন, ‘তারা এবার ঈদ করতে পারছেন না। গত বছর তারা গরু কুরবানিতে শেয়ার ছিলেন। এবছর আর কুরবানি করতে পারছেন না। সুন্দরবনে মাছ, কাঁকড়া ধরে তাদের জীবন চলে। সেটিও বন্ধ।
স্থানীয়রা বলছেন, তাদের ঈদ-আনন্দ নেই। আম্পান লোনা পানিতে ছিন্ন বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছে। সেই সঙ্গে নদীতে মাছ, কাঁকড়া ধরা নিষিদ্ধ রয়েছে। জনপদ ডুবে আছে আম্পানের বাঁধভাঙা পানিতে।
বুড়িগোয়ালিনী এলাকার হানিফ গাজী, সাজাহান সরদারসহ আরো কয়েকজন জেলে বলেন, এবারের ঈদ-আনন্দ তাদের কপালে নেই। একদিকে আম্পান তছনছ করে দিয়েছে সব। সেইসঙ্গে নদীতে মাছ, কাঁকড়া ধরা নিষেধ। কী করে হবে আমাদের ঈদ?
বুড়িগোয়ালিনীর নুর ইসলাম সানা বলেন, ‘এমনিতেই তো ডুবে আছি আম্পানের বাঁধভাঙা লোনা পানিতে। সঙ্গে আছে করোনা। আমরা যাবো কোন দিকে?’
গাবুরা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মাসুদুল আলম বলেন, সরকারিভাবে সুন্দরবনে মাছ শিকার বন্ধ আছে ১ জুলাই থেকে আগস্ট পর্যন্ত। সরকারিভাবে এই জেলে বাওয়ালিদের জন্য ৮৬ কেজি করে চাল বরাদ্দ হয়েছে। জেলে হিসেবে যাদের কার্ড আছে তারাই কেবল চাল পেয়েছেন।
তিনি আরও বলেন, করোনায় মানুষের কাজ নেই। কিছু সরকারি-বেসকারি সাহায্য পেয়েছেন। মোবাইল নম্বর ভুল হওয়ায় কিছু বাকি আছে। তারপরও এই ইউনিয়নে মানুষ বর্তমান সময় খুব কষ্টে দিন কাটাচ্ছে। ঈদুল আজহা সবাই পালন করলেও এই এলাকার মানুষের মনে ঈদ-আনন্দ নেই।
বুড়িগোয়ালিনী ইউপি চেয়ারম্যান ভবতোষকুমার মণ্ডল বলেন, ‘প্রজননের কারণে মাছ শিকার বন্ধ আছে ১ জুলাই থেকে ৩১ আগস্ট পর্যন্ত। তবে সরকার এই জেলে বাওয়ালিদের জন্য ৮৬ কেজি করে চাল দিয়েছে। আমার ইউনিয়নের জেলে বাওয়ালিদের বর্তমান সময় খুব কষ্টে দিন যাচ্ছে। আমরা ইউনিয়ন পরিষদ থেকে শুধু চাল দিচ্ছি। তবে এই জেলেরা বাজার সওদা কোথায় পাবে? এই ঈদে জেলেদের মনে আনন্দ নেই।’
প্রতাপনগর ইউপি চেয়ারম্যান জাকির হোসেন বলেন, ঘূর্ণিঝড় মে মাসের ২০ তারিখে আঘাত হানলেও তার ইউনিয়নের অধিকাংশ মানুষ এখনো পানিবন্দি। এখানকার মানুষ কী কষ্টে আছে সেটা দেখার কেউ নেই। আম্পানে ক্ষতিগ্রস্ত পাঁচ হাজার ৯৫০ পরিবারের মাঝে দশ কেজি করে সরকারি চাল বিতরণ করা হয়েছে।
আশাশুনি উপজেলা নির্বাহী অফিসার মীর আলিফ রেজা বলেন, উপজেলার ৫৯ হাজার পরিবারের মাঝে দশ কেজি করে চাল দেওয়া হয়েছে।
শ্যামনগর উপজেলা নির্বাহী অফিসার আ ন ম আবুজর গিফারী বলেন, উপজেলার ৭৯ হাজার ৯৭টি পরিবারকে দশ কেজি করে চাল দেওয়া হয়েছে। নিম্নবিত্তদের জন্য এবার বিশেষভাবে ১৮টি বিভিন্ন সংস্থা থেকে কুরবানি করে মাংস বিতরণ করা হবে। আশ্রয়ণ প্রকল্পের মানুষের কুরবানির মাংস এবং আম্পানে দুর্গতদের মাঝেও মাংস বিতরণ করা হবে।
সূত্র : বাংলা ট্রিবিউন

আরও পড়ুন