‘গলাকাটা ভিটা’ নিয়ে নানা লোককাহিনি

আপডেট: 05:41:02 21/09/2020



img

রূপক মুখার্জি, লোহাগড়া (নড়াইল) : লোহাগড়া উপজেলার মঙ্গলহাটা গ্রামের একটি স্থানের নাম ‘গলাকাটা ভিটা’। নামে ভিটা হলেও এখন জঙ্গলই বলা চলে। সেখানে কোনো বাড়িঘর নেই। আছে শুধু গা ছমছমে পরিবেশ। আশপাশের বাসিন্দাদের কাছে প্রচলিত গল্পটা হলো, প্রায় একশ’ বছর আগে এখানে এক অচেনা ব্যক্তির গলাকাটা লাশ পাওয়া গিয়েছিল। এরপর বিভিন্ন সময়ে অনেকেই এ জায়গায় অস্বাভাবিক সব দৃশ্য দেখার দাবি করেছেন। দিনে দিনে তাই এর নাম হয়েছে ‘গলাকাটা ভিটা’।
লোকমুখে প্রচারিত গল্প হলো- এখনো এখানে রাতের বেলায় একটা মুণ্ডুহীন অবয়ব দেখা যায়। বয়স্ক ব্যক্তিদের কেউ তা নিজ চোখে দেখেছেন বলে দাবি করেন। আবার অনেকের ভাষ্য, তাদের পূর্বপুরুষেরা দেখেছেন। যদিও আধুনিকমনস্করা এই দাবি মানতে নারাজ। তারা একে স্রেফ ‘লোককাহিনি’ বলে অভিহিত করেন।
তবিবর রহমানের বয়স সত্তরের কাছাকাছি। তিনি জানালেন, ‘না দেখে কেউ কোনো কিছু বিশ্বাস করতে চায় না। আমিও বলতাম, ওসব ফালতু কথা। মানুষ বানিয়ে বলে। কিন্তু একদিন রাতে আমি বেহুঁশ হয়ে গিয়েছিলাম।’
এরপর স্মৃতি হাতড়ে বলা শুরু করলেন, ‘একা একা বাড়ি ফিরছিলাম। রাত খুব বেশি না হলেও অন্ধকার ছিল। ভিটার কাছে আসতেই এর ইতিহাস মনে পড়ে গেল। গা শিরশির করে উঠল আমার। ভয়ে ভয়ে সামনের দিকে এগোতে লাগলাম। হঠাৎ দেখি একটা আলোর অবয়ব। ভয়ে চিৎকার শুরু করি। কিন্তু মনে হলো, কেউ আমার চিৎকার শুনছে না। কারণ গলা দিয়ে শব্দই বের হচ্ছিল না। দেখলাম একটা গলাকাটা মানুষের শরীর। পুরো শরীরে রক্ত আর রক্ত। এ ভিটা থেকে বেরিয়ে সোজা পশ্চিমে নদীর দিকে চলে গেল। আমি দৌঁড় দিতে গিয়ে অজ্ঞান হয়ে যাই। এরপর টানা তিন মাস জ্বরে ভুগেছি। দৃশ্যটা মনে পড়লে এখনো শিউরে উঠি।’
খুশি বেগমের বয়স ৮০ বছর ছুঁই ছুঁই। তিনি বললেন, ‘‘গলাকাটা ভিটার পাশে আগে অনেক খেজুরগাছ ছিল। আমার স্বামী গাছি ছিলেন। তিনি একদিন অসুস্থ থাকায় আমার বড় ছেলেকে গাছে কলস বাঁধতে পাঠালেন। তার বয়স তখন ১২-১৩ হবে। আমিও তার সঙ্গে গেলাম। ছেলে একের পর এক গাছে কলস বাঁধছে। আমি নিচে দাঁড়িয়ে দেখছি। সন্ধ্যা ঘনিয়ে এলো। আর ৫-৬টি গাছ বাকি। একটি সরু খেজুরগাছে ছেলে উঠছে, আমি তাকিয়ে আছি। হঠাৎ দেখি, যে গাছে ছেলে উঠছে, সে গাছের মাথায় সাদা কাপড় পরা একটা লোক দাঁড়িয়ে আছে। কিন্তু তার মাথা নেই। আমি চিৎকার দিয়ে বললাম, বাবা, নেমে আয়! আর ওঠা লাগবে না। আমার চিৎকার শুনে সে নেমে এসে বলল, ‘কী হয়েছে?’ আমি কিছু বলতে পারলাম না। দুইজনে বাড়ি চলে আসি। পরে আমার ছেলে বলল, সে কিছু দেখেনি। কিন্তু আমি স্পষ্ট দেখেছি, সাদা কাপড় পরা গলাকাটা লোকটাকে।’’
মতিউর রহমান নামে আরেক গ্রামবাসী বলেন, ‘অনেক রাত পর্যন্ত চলাফেরা করতাম। ভূত-প্রেতে বিশ্বাস করতাম না। কিন্তু একদিন রাত ১২টার দিকে ঘুরছি। গলাকাটা ভিটার কাছে কিছু বড় মরা গাছ ছিল। আমি ওই গাছগুলোর দিকে তাকিয়ে একটা কিছু ভাবছিলাম। হঠাৎ দেখি ইয়া বড় মানুষের আকৃতির মতো একটা কিছু। সে একটা গাছের ওপর পা মেলে বসে আছে। প্রথমে ভাবলাম, চোখের ভুল বা হয়তো আলোছোয়ার কারণে এমনটা মনে হচ্ছে। কিন্তু চারিদিকে তাকিয়ে দেখি, কোনো আলোর উৎস নেই। খুব ভয় পেয়ে গেলাম। মানুষের মুখে শোনা গল্পগুলো মনে পড়ে যাওয়ায় ভয় বেড়ে দ্বিগুণ। তারপর দিলাম দৌঁড়। সেই থেকে আর রাতে ঘুরতে বের হই না। সন্ধ্যার পরে তো ওই ভিটার দিকে ফিরেও তাকাই না।’
নড়াইল ভিক্টোরিয়া কলেজের দ্বিতীয় বর্ষে পড়ছে সুমন আহমেদ। গলাকাটা ভিটার সামনে দিয়েই বাড়িতে যেতে হয় তাকে। সে জানালো সাম্প্রতিক এক ঘটনা- ‘একদিন রাতে সিনেমা দেখে বাড়ি ফিরছি। সঙ্গে কেউ নেই। একটু ভয়ে ভয়ে হাঁটছি। গলাকাটা ভিটার কাছে আসতেই ভয় আরো বেড়ে যায়। কিছু না দেখার ভান করে সামনে হাঁটতে থাকি। হঠাৎ একটা বিকট শব্দ। মনে হলো, ওপর থেকে একটা কিছু ভেঙে পড়ছে। তাকিয়ে দেখি, বিশাল এক গাছের মধ্যে কালো একটা কিছু বসে আছে। সে আমাকে ধরার জন্যই বারবার ডালটাকে নিচের দিকে নামাতে চাচ্ছে। এটা দেখে আর কে দাঁড়ায়! দিলাম দৌড়। এরপর কয়েক দিন অসুস্থ ছিলাম।’
এলাকার মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক মিজানুর রহমান বলেন, ‘গলাকাটা ভিটা নিয়ে মানুষের নানা ভৌতিক গল্প শুনে আসছি। রাতে এটা-ওটা দেখে আর দিনে গল্প করে। আমি এ এলাকায় থাকলেও কখনো কিছু দেখিনি। আর আমার এসবে তেমন বিশ্বাস নেই। আমি মনে করি, এগুলো মনের ভুল ছাড়া কিছু নয়।’