‘চাল চুরি ঢাকতে’ জোর করে গরিব নারীদের সই আদায়!

আপডেট: 04:41:35 16/05/2020



img

রূপক মুখার্জি, লোহাগড়া (নড়াইল) : করোনা পরিস্থিতি শুরুর পর থেকে নড়াইলের বিভিন্ন এলাকায় গরিবের জন্য বরাদ্দ চাল চুরির ঘটনা ঘটেই চলেছে। ইতিমধ্যে চেয়ারম্যানসহ কয়েকজন জনপ্রতিনিধি জেলে গেছেন; সাসপেন্ড হয়েছেন (সাময়িক বরখাস্ত)। আবার কেউ কেউ পালিয়ে বেড়াচ্ছেন।
ভিজিডির ৪১ টন চাল চুরির অভিযোগে দুদকের মামলায় জেলহাজতে পিরোলী ইউপি চেয়ারম্যান জারজিদ মোল্যা। এলাকার ৮৫ জন দুস্থ নারীর ১৬ মাসের চাল আত্মসাতের অভিযোগ তার বিরুদ্ধে। চাল না পাওয়া গরিব নারীদের জোর করে মাস্টার রোলে টিপসই দিতে বাধ্য করেছেন তিনি। গরিব মানুষের মুখ বন্ধ করতে সন্ত্রাসী বাহিনী ঢুকিয়ে গুচ্ছগ্রামে গুলিবর্ষণের মতো ঘটনাও ঘটানো হয়েছে।
স্থানীয়রা অভিযোগ করছেন, চেয়ারম্যান কারাগারে যাওয়ার পরও থেমে নেই অপতৎপরতা। ‘চুরি ঢাকতে’ মাঠে নেমেছে চেয়ারম্যানের সন্ত্রাসী বাহিনী। এরা প্রতিদিন বিভিন্ন গ্রামে ঢুকে চাল না পাওয়া অসহায়-দুস্থ নারীদের ভয়ভীতি দেখিয়ে মাস্টাররোলে টিপ সই আদায় করে নিচ্ছেন। ভয়ে কেউ স্বাক্ষর করে দিচ্ছেন আবার অনেকে টিপ সই না দিয়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন।
স্থানীয়রা বলছেন, সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর আওতায় পিরোলী ইউনিয়নের ১৯০ জন ভিজিডি কার্ডধারী দুস্থ নারীকে বিনামূল্যে প্রতিমাসে ৩০ কেজি করে চাল দেওয়ার কথা। প্রতিমাসে চাল উত্তোলন করলেও ভিজিডি কার্ডধারী ৮৫ নারীকে ২০১৯ সালের জানুয়ারি থেকে চলতি বছরের এপ্রিল পর্যন্ত চাল দেওয়া হয়নি। ৮৫ জনের বিপরীতে ১৬ মাসে (মাসিক দুই হাজার ৫৫০ কেজি করে) মোট ৪০ টন ৮০০ কেজি সরকারি চাল দুর্নীতির আশ্রয় নিয়ে বা বেআইনি পন্থায় আত্মসাৎ করেছেন চেয়ারম্যান জারজিদ। এই অভিযোগের প্রাথমিক প্রমাণ পেয়ে দুদকে মামলা করে তদারককারী প্রতিষ্ঠান মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তর। ২১ এপ্রিল দুদকে মামলার পর ২৩ এপ্রিল সাময়িক বরখাস্ত (সাসপেন্ড) হন চেয়ারম্যান। ১ মে নিজ বাড়ি খড়রিয়া গ্রাম থেকে চেয়ারম্যান জারজিদ মোল্যাকে গ্রেফতার করে ডিবি পুলিশ।
জুয়া খেলার ছবি তোলায় সাংবাদিক পেটানো, একাধিক হত্যা, জুয়া ও মাদক, বসতবাড়ি উচ্ছেদ, ভ‚মি অফিসের নায়েবকে পেটানোসহ ডজনখানেক মামলা রয়েছে এই চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে। কিন্তু আলোচিত সন্ত্রাসী ও কথিত ইয়াবাসেবী চেয়ারম্যানকে গ্রেফতারের পরও স্বস্তিতে নেই এলাকার নিরীহ লোকজন। নানা ছলে আর ভয়ভীতি দেখিয়ে দুস্থ নারীদের চাল না দিয়ে উল্টো তাদের কাছ থেকে ১৬ মাসের মাস্টার রোলে টিপ সই নেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ।
গ্রেফতার হওয়ার আগে ২৬ এপ্রিল জামরিলডাঙ্গা .গ্রামের পাঁচ নারীকে চাল দেওয়ার কথা বলে ইউনিয়ন পরিষদে ডেকে নেওয়া হয়। এরপর দোতলার একটি কক্ষে আটকে রেখে চেয়ারম্যানের উপস্থিতিতে প্রত্যেককে ১৬টি করে মাস্টাররোলে টিপসই নিয়ে বাড়ি পাঠিয়ে দেওয়া হয়। কাঁদতে কাঁদতে খালি হাতে ফিরে আসেন অসহায় নারীরা।
ভয়ে টিপ সই দিতে বাধ্য হওয়া পেড়লী গ্রামের পাঁচ নারীর মধ্যে ১৫১ তালিকার হুরী বেগম, ১৪৯ তালিকার নুরনাহার ও ১৫৩ তালিকার ছায়েরা বিবির দিন এখন আরো কষ্টে কাটছে। বাড়িতে এসে টিপ সই দেওয়ার কথা বলে দেওয়ায় হুমকির মধ্যে পড়েছেন তারা। বাকিরা ভয়ে অন্যকে কিছু জানাতে পারছেন না। চেয়াম্যানের সন্ত্রাসী বাহিনী ২৭ থেকে ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত খড়রিয়া গ্রামের চাল না পাওয়া অন্তত আট নারীর কাছ থেকে জোর করে টিপ সই নিয়েছে। ভয়ে কোনো কথা বলতে পারেননি হতদরিদ্র এই নারীরা।
স্থানীয় সূত্র মতে, গত ৮ মে রাতে পেড়লী গ্রামের মরজিনা বেগমের বাড়িতে আসে চেয়ারম্যানের সন্ত্রাসী বাহিনী। চেয়ারম্যান জারজিদের স্ত্রী মুর্শিদার সঙ্গে শহীদুল ভূঁইয়া, বাবলু ভূঁইয়া, শিহাব ভূঁইয়ার নেতৃতে ৮-১০ জনের একটি দল বাড়িতে ঢুকে দেশি অস্ত্র দেখিয়ে মরজিনার ১৬টি টিপ সই নেয় মাস্টাররালে। এই ঘটনায় জানাজানি হলে গ্রামে হইচই পড়ে যায়। ইউপি মেম্বার লেন্টু, ফুরকান ও মুক্তি মিলে প্রতিরোধ গড়ে তোলার চেষ্টা করেন। খবর পেয়ে পুলিশ এলে সন্ত্রাসীরা পালিয়ে যায়।
এদিকে কার্ড থাকলেও ১৬ মাস চাল পান না পেড়লী গ্রামের আরো অন্তত দশজন। এদের মধ্যে ১৬০ ক্রমিকের পিয়ারী বেগম, ১৬১ ক্রমিকের হেনা বেগম, ১৬২ ক্রমিকের নার্গিস বেগম, ১৬৩ ক্রমিকের সিমকী খাতুন, ১৬৭ ক্রমিকের রোজিনা বেগম, ১৭২ ক্রমিকের রেবেকা বেগম রয়েছেন। চেয়ারম্যানের সন্ত্রাসীদের ভয়ে নিজেদের বাড়ি ছেড়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন এসব নারী।
টিপ সই দিতে নারাজ পলাতক এক নারীর ভাষ্য, ‘এমনিতে আমাদের চাল মেরে খেয়েছে চেয়ারম্যান। তার ওপর তার বাহিনী দিয়ে জোর করে মাস্টাররোলে স্বাক্ষর করায়ে নিচ্ছে। করোনার চেয়ে বেশি ভয় পাচ্ছি গুন্ডাদের। এই দেশে কি কোনো আইন কানুন নেই?’
পিরোলী ইউনিয়নের পাঁচ নম্বর ওয়ার্ড মেম্বার গোলাম রব্বানী, সাত নম্বর ওয়ার্ড মেম্বার মো. লেন্টু শেখ বলেন, চেয়ারম্যান নিজে তাদের গ্রামের ভিজিডি কার্ডের নাম কেটে নিজের গ্রামে দিয়েছেন। অল্প কয়েকজন গরিব মহিলা চাল পেতেন। তাদের মাল না দিয়ে উল্টো বাহিনী দিয়ে স্বাক্ষর করিয়ে নিচ্ছে। এটা চরম অন্যায়।
আট নম্বর ওয়ার্ড মেম্বার মো. ফুরকান শেখ বলেন, ‘এলাকার কয়েকজন ভিক্ষুক মহিলাকে ভিজিডি কার্ড করে দেওয়া হয়েছিল। তাদের চাল মেরে দিয়ে চেয়ারম্যান চরম অন্যায় কাজ করেছেন। এখন আবার সন্ত্রাসীরা জোর করে স্বাক্ষর নিয়ে চেয়ারম্যানকে নির্দোষ প্রমাণ করতে চাচ্ছে।’
সন্ত্রাসী বাহিনীর নেতৃত্বদানে অভিযুক্ত চেয়ারম্যান জারজিদ মোল্যার স্ত্রী মুর্শিদা খানম বলেন, ‘আমরা তো জোর করে কারো স্বাক্ষর আনিনি। আপনাকে এই অভিযোগ কে দিয়েছে?’
আপনারা কি ১৬ মাসের চাল দিয়ে স্বাক্ষর আনছেন?- এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘চাল তো চেয়ারম্যান দিয়েই গেছেন।’
কালিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. নাজমুল হুদা বলেন, ‘১৬ মাস ধরে ৮৫ জন হতদরিদ্র ভিজিডির মাল পায় না- এ ধরনের তথ্যপ্রমাণ আমাদের কাছে আছে। এখন জবরদস্তি করে গরিব মানুষকে হয়রানি করলেও তাদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’

আরও পড়ুন