‘পাখির গ্রামে’ ভালো নেই পাখিরা

আপডেট: 03:58:52 10/11/2020



img

ঝিনাইদহ প্রতিনিধি : পাখিরা আকাশে ডানা মেলে উড়ছে, কেউবা বাসা বেঁধেছে গাছের উঁচু ডালে। চিত্রটি ঝিনাইদহের শৈলকুপা উপজেলার আশুরহাট গ্রামের।
পাখিদের প্রতি পরম ভালোবাসা থেকে নিজ গ্রামকে পাখির অভয়ারণ্য হিসাবে গড়ে তুলেছে তারা।
কিন্তু বর্তমানে শিকারীদের অত্যাচারে শান্তিতে নেই এখানকার পাখিরা। দিনে গ্রামবাসী পাহারার ব্যবস্থা করলেও রাতের আঁধারে শিকারীরা তৎপর হয়ে ওঠে।
শৈলকুপা উপজেলার প্রত্যন্ত গ্রাম আশুরহাট। এই গ্রামের মধ্যপাড়ায় পুরনো আমলের তিনটি বিশালাকার দিঘি রয়েছে। দিঘির চারিপাড়ে রয়েছে বড় বড় শিমুল, কড়াই, মেহগনি, জামগাছসহ ঘন বনজঙ্গল। ২০১০ সাল থেকে গ্রামটির দিঘিগুলোর পাড়ের গাছে এশীয় শামুকখৈল ও পানকৌড়ি পাখি বাসা বাঁধতে শুরু করে। ভোরে পাখিরা আহার সংগ্রহে বের হতো। সন্ধ্যার আগে আবার ফিরে ওইসব গাছে রাত কাটাতো। শীতশেষে তারা চলে যায়। পরের বছর আবার এসে সেইসব গাছেই আশ্রয় নেয়। প্রথমদিকে তারা আসা-যাওয়া করতে থাকলেও গত ছয় বছর থেকে ওই শিমুল গাছে তারা  স্থায়ীভাবে বাসা বেঁধে বসবাস শুরু করছে। এখন তারা নিয়মিত প্রজননের মাধ্যমে ডিম থেকে বাচ্চা ফুটাচ্ছে। এতে দ্রুত বংশ বিস্তার হয়। আর পাখির সংখ্যা বহুগুণ বেড়ে গেছে। অল্পদিনেই গ্রামটি পাখির আশ্রম হয়ে ওঠে। গ্রামে শুধু এসব পাখিই নয়, বিকেল হলে ডোবা-নালা ঘিরে বসে শালিক, ঘুঘু, বকসহ ৪-৫ হাজার দেশি পাখি। পাখিদের অবস্থানে অপরূপ সৌন্দর্যে ভরে ওঠে চারিদিক।
এই গ্রামের আব্দুর রাজ্জাক জানান, বর্তমানে এখানে পাখির সংখ্যা প্রায় ২০ হাজার। শামুকখৈল ছাড়া এরা শামুক ভাঙ্গা এশিয়ান ওপেন বিল স্কক নামেও পরিচিত। নিজেদের গ্রামকে 'পাখির অভয়ারণ্য' ঘোষণা করে স্থানীয়রা দিনেরাতে এদের পাহারা দিয়ে আসছে। তারপরেও বিভিন্ন অঞ্চল থেকে শিকারীরা বন্দুক নিয়ে এ শামুখভাঙা পাখি শিকার করতে আসে। এ নিয়ে শিকারীদের সঙ্গে গ্রামবাসীর প্রায়ই গোলযোগ হয়। দূর-দূরান্ত থেকে প্রতিদিন প্রচুর মানুষ এখানে পাখি দেখতে ভীড় আসে। বর্তমানে গ্রামটির বদলে গেছে; অনেকেই এই গ্রামকে 'পাখির গ্রাম' বলে চেনে।
পাখি প্রেমিক রেহানা খাতুন জানান, গত বছরে উপজেলা প্রশাসন পাখি রক্ষার জন্য দুটি সাইনবোর্ড দিয়েছে। আর দিনের বেলায় পাহারা দেওয়ার জন্য দুইজন গ্রামপুলিশ মোতায়েন করা হয়। কিন্তু পাহারা উঠে যাওয়ার পর থেকে আবারো পাখি নিধন শুরু হয়েছে। এখানে রাতের অন্ধকারে লোকজন এসে পাখি ধরে জবাই করে বস্তায় ভরে নিয়ে যায়। বিলুপ্ত প্রজাতির পাখি রক্ষার জন্য সরকারকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের আহ্বন জানান তিনি।
ফাতেমা রহমান নামে এক নারী বলেন, ‘আমরা শিকারিদের হাত থেকে পাখিগুলো রক্ষা করতে পারছি না। এজন্যে প্রশাসনের কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।’
এই গ্রামের মতলেব মিয়া জানান, পাখিগুলো রক্ষার জন্য গ্রামবাসীদের পক্ষ থেকে প্রশাসনের কাছে অনেক কিছুই বলা হয়েছে। দুঃখজনক হলো, আজ পর্যন্ত পাখিগুলোর বিষয়ে প্রশাসন কোনো সিদ্ধান্ত নেয়নি।
জেলা প্রশাসক সরোজকুমার নাথ জানান, গত ৭-৮ বছর গ্রামটিতে হাজার হাজার এশীয় শামুকখৈল ও পানকৌড়ি পাখি বাসা বেঁধেছে। এখানে তারা প্রজননের মাধ্যমে ডিম থেকে বাচ্চা ফুটিয়ে বংশ বৃদ্ধি করে চলেছে। গ্রামটি এখন 'পাখির গ্রাম' বলে দেশ-বিদেশে পরিচিত হয়ে উঠেছে। তিনি আরো বলেন, ‘ এসব পাখি রক্ষায় আমরা সব ধরনের ব্যবস্থা নিচ্ছি।’