‘পেঁয়াজে স্বয়ংসম্পূর্ণ হওয়া সম্ভব ছয় বছরে’

আপডেট: 03:35:13 20/09/2020



img
img

সায়েদুল ইসলাম : ভারত পেঁয়াজ রপ্তানি বন্ধ ঘোষণার পর থেকেই অস্থির হয়ে উঠেছিল বাংলাদেশের পেঁয়াজের বাজার। কয়েক দিনের ব্যবধানে পেঁয়াজের দাম দ্বিগুণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। আবার সেই ভারত অল্প কিছু পেঁয়াজ রপ্তানি করবে- এই খবরে দাম কিছুটা কমেও যেতে দেখা গেছে।
গত বছরও ভারত যখন পেঁয়াজ রপ্তানি বন্ধ করার ঘোষণা দিয়েছিল, বাংলাদেশে এই মসলাটির দাম রেকর্ড তিনশ’ টাকা ছাড়িয়ে গিয়েছিল।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশে পেঁয়াজের মোট চাহিদার প্রায় ৫৭ শতাংশ দেশে উৎপাদিত হয়। বাকিটা বিদেশ থেকে, প্রধানত ভারত থেকে আমদানি করতে হয়। এ কারণেই পেয়াঁজের ব্যাপারে ভারত কোনো সিদ্ধান্ত নিলে তার প্রভাব পড়ে বাংলাদেশের বাজারে।
এছাড়া মিয়ানমার, মিশর, তুরস্ক, চীন থেকেও বাংলাদেশে অল্প কিছু পেঁয়াজ আমদানি হয়ে থাকে।
কিন্তু কৃষি প্রধান একটি দেশ হয়েও বাংলাদেশ কেন পেঁয়াজ উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণ নয়? দেশের পেঁয়াজের চাহিদা দেশেই কীভাবে মেটানো সম্ভব?

চাহিদা আর উৎপাদনের ফারাক
বাংলাদেশের কৃষি অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, দেশে পেঁয়াজের চাহিদা রয়েছে ৩০ লাখ টনের মতো।
২০২০ সালে বাংলাদেশে পেঁয়াজ উৎপাদন হয়েছে ২৫ লাখ ৫৭ হাজার টন। তবে এই উৎপাদন থেকে গড়ে ২৫-৩০ শতাংশ নষ্ট হয়ে যায়।
ফলে দেশে মোট পেঁয়াজের উৎপাদন গিয়ে দাঁড়ায় ১৮ থেকে ১৯ লাখ টনে। অথচ দেশের বাকি চাহিদা পূরণ করতে প্রায় ১১ লাখ টন পেঁয়াজ আমদানি করতে হয়।
প্রতিবেশী দেশ, সড়কপথে দ্রুত আনা, কম দাম বিবেচনায় প্রধানত ভারত থেকেই বেশিরভাগ পেঁয়াজ আমদানি করা হয়।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশের চাহিদার পুরোটা পূরণ করতে হলে দেশেই অন্তত ৩৫ লাখ টন পেঁয়াজের উৎপাদন করতে হবে। তাহলে যেটুকু নষ্ট হবে, তা বাদ দিয়ে বাকি পেঁয়াজ দিয়ে দেশের পুরো চাহিদা পূরণ সম্ভব হবে।

যে কারণে চাহিদার পুরোটা পূরণ করা যায় না
কৃষিপ্রধান দেশ হয়েও পেঁয়াজের চাহিদা পূরণ করতে না পারার পেছনে কয়েকটি কারণকে দায়ী করছেন বিশেষজ্ঞরা।
বাংলাদেশে ‘মসলা জাতীয় ফসলের গবেষণা জোরদারকরণ প্রকল্পের’ পরিচালক ড. শৈলেন্দ্রনাথ মজুমদার। মসলা গবেষণা কেন্দ্রে তিনি পেঁয়াজ চাষের বিষয়গুলো দেখেন।
তিনি বলছেন, ‘পেঁয়াজ উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণ হওয়া আমাদের পক্ষে খুব সম্ভব। কৃষকদেরও আগ্রহ আছে। কিন্তু কিছু সমস্যা আছে। পেঁয়াজ উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণ হতে হলে এই সমস্যাগুলোর সমাধান আগে করতে হবে।’
আলাপকালে বাংলাদেশে পেঁয়াজের ঘাটতির পেছনে বেশ কিছু কারণ তিনি চিহ্নিত করেছেন। সেগুলো কীভাবে সমাধান করা যায়, এ নিয়ে তার কিছু পরামর্শ রয়েছে।

বীজের অভাব
বাংলাদেশের কৃষকদের জন্য পেঁয়াজের ভালো ও উন্নত বীজের অভাব রয়েছে।
ড. শৈলেন্দ্রনাথ মজুমদার বলছেন, "আমাদের দেশে প্রতিবছর মোট এক হাজার ১০০ টন পেঁয়াজের বীজের দরকার হয়। সরকারিভাবে পাঁচ-ছয় টন, বেসরকারি কোম্পানিগুলো ৫০-৬০ টন পেঁয়াজ বীজ উৎপাদন করে। বাকিটা কৃষকরা উৎপাদন করেন।"
পেঁয়াজ উৎপাদন বাড়াতে হলে এই বীজের উৎপাদন এবং সংরক্ষণও বাড়াতে হবে।
এক কেজি পেঁয়াজের বীজে দুই বিঘা জমিতে পেঁয়াজ চাষ করা হয়। একেক বিঘায় গড়ে ৪০ মণ দেশি পেঁয়াজ উৎপাদিত হয়।
গত বছর এক কেজি পেঁয়াজের বীজের দাম আড়াই হাজার টাকা, অর্থাৎ এক মণ পেঁয়াজ এক লাখ টাকায় বিক্রি হয়েছে। কিন্তু এই বছর দুই লাখ টাকা দিয়েও এক মণ পেঁয়াজের বীজ পাওয়া যাচ্ছে না। এর প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে সামনের বছরের উৎপাদনে।

সমন্বিত চাষাবাদ
"ঘাটতি দশ লাখ টন পূরণ করার জন্য আমাদের বাড়তি জমিরও দরকার হয় না। আমাদের যে দুই লাখ ৩৭ হাজার জমিতে পেঁয়াজ চাষ হয়, সেখানেই ভালো জাত আর উৎপাদন কলাকৌশলে পরিবর্তন আনলে, কৃষকদের একটু প্রশিক্ষণ দিতে পারলেই চার-পাঁচ লাখ টন উৎপাদন বাড়ানো যায়", বলছেন ড. মজুমদার।
"সেই সঙ্গে আমাদের অন্যান্য ফসলের সঙ্গে, যেমন আখের ক্ষেতে, ভুট্টার ভেতর, আদা-হলুদের সঙ্গে পেঁয়াজ চাষ করা যায়। গরমের সময় কচুমুখীর ক্ষেতে চাষ করা যায়।"
তারা এখন পেঁয়াজ চাষের উপযোগী এলাকাগুলোর কৃষকদের পরামর্শ দিচ্ছেন, তারা যেন অন্য ফসলের সঙ্গে পেঁয়াজও চাষ করেন।

দামের ওঠা-নামা
ড. মজুমদার বলছেন, পেঁয়াজ চাষাবাদ বাড়ানোর ক্ষেত্রে আরেকটি বড় সমস্যা হলো এর দামের ওঠা-নামা। কখনো কৃষক চাষাবাদ করে লোকসানের মুখে পড়েন। আবার কখনো অতিরিক্ত দামের কারণে বীজ পেঁয়াজ বিক্রি করে দেন।
গতবছর দাম বেড়ে যাওয়ার কারণে অধিকাংশ কৃষক অক্টোবর মাসে তাদের পেঁয়াজ বীজ বিক্রি করে দিয়েছেন। ফলে অনেক কৃষক এই বছর বীজ খুঁজে পাচ্ছেন না।
আবার ২০১৯ সালের এপ্রিল মাসে পেঁয়াজের মণ ছিল ৪০০ টাকা, যেখানে একমণ উৎপাদন করতে তাদের খরচ হয়েছে ৬৫০ টাকা। ফলে লোকসান হওয়ায় স্বাভাবিকভাবেই অনেক কৃষক আর পেঁয়াজ চাষে উৎসাহিত হন না।
তিনি বলছেন, "গতবছর ডিসেম্বরে ফরিদপুর এবং পাবনার কৃষকদের সঙ্গে আমরা দুইটা কর্মশালা করেছিলাম। তারা বলেছেন, আমরা ৩৫ কেন, ৪০ লাখ টন পেঁয়াজ উৎপাদন করে দেবো, আপনারা আমাদের দামটা ঠিক করে দেন।"
ড. মজুমদার মনে করেন, কৃষকের চাষাবাদের খরচ বিবেচনায় রেখে মিয়ানমারের মতোও পেঁয়াজের সর্বনিম্ন ও সর্বোচ্চ দাম নির্ধারণ করে দেওয়া উচিত, যাতে কৃষকরা ক্ষতিগ্রস্ত না হয়। লাভজনক হলে প্রতিবছরই কৃষকরা পেঁয়াজ চাষে উৎসাহিত হবেন, ঘাটতিও কমে আসবে।
বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইন্সটিটিউট, গাজীপুরের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. রুম্মান আরা বলছেন, পেঁয়াজের দামটা যাতে উপযুক্ত থাকে, সেজন্য দেশে একটা নীতি নেওয়া দরকার, যাতে কৃষক এই ফসল উৎপাদন করে হতাশ হয়ে না পড়েন।

সংরক্ষণ ব্যবস্থা
বাংলাদেশে শুধুমাত্র পেঁয়াজ সংরক্ষণের জন্য কোনো কোল্ড স্টোরেজ নেই। কিন্তু সারা বছরের চাহিদা মেটানোর মতো পেঁয়াজ উৎপাদন করতে হলে সেটা সংরক্ষণের ব্যবস্থা রাখতে হবে।
বর্তমানে কৃষকরা নিজেদের বাড়িতে দেশীয় পদ্ধতিতে সংরক্ষণ করে থাকেন। কিন্তু তাতে পেঁয়াজ নষ্ট হওয়ার হারটা বেশি হয়।
পেঁয়াজের জন্য ১২ থেকে ২০ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড তাপমাত্রা দরকার। আর্দ্রতা থাকতে হবে ৩৫ থেকে ৪৫-এর মধ্যে। ফরিদপুর, পাবনা, রাজবাড়ীর মতো যেসব স্থানে পেঁয়াজের আবাদ বেশি হয়, সেখানে এরকম অনেকগুলো কোল্ড স্টোরেজ থাকলে কৃষকরা পেঁয়াজটা সংরক্ষণ করে রাখতে পারতেন। ফলে তারা বেশি করে উৎপাদন করতেন।
এখন যেভাবে সংরক্ষণ করা হয়, তাতে অনেক সময় পেঁয়াজে গাছ গজিয়ে যায়।
"ঠিকভাবে সংরক্ষণ করতে পারলে কৃষক দামও পেতেন, বাড়তি চাষাবাদে উৎসাহিত হতেন," বলছেন বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনসটিটিউট, গাজীপুরের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. রুম্মান আরা।
কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, আপাতত বিশেষ একটি কোল্ড স্টোরেজ এবং পরীক্ষামূলক গ্রিন হাউজ করার পরিকল্পনা করছে সরকার।

গ্রীষ্মকালীন পেঁয়াজ উৎপাদন
বাংলাদেশের কৃষি গবেষণা ইন্সটিটিউটের মসলা গবেষণা কেন্দ্র বর্তমানে পেঁয়াজের ছয়টি জাত অবমুক্ত করেছে। তার মধ্যে তিনটি জাত গ্রীষ্মকালীন। সেগুলোর ভেতর বারি-৫ এর ওপর গবেষণাকারীরা সবচেয়ে বেশি জোর দিচ্ছেন।
মার্চ মাসে রোপণ করে জুন-জুলাই মাসে অথবা আগস্ট মাসে রোপণ করে নভেম্বর-ডিসেম্বর মাসে এসব পেঁয়াজের ফসল পাওয়া যায়।
ড. রুম্মান আরা বলছেন, "এসব গ্রীষ্মকালীন পেঁয়াজ চাষাবাদ করলে সেটা চাহিদার বড় একটি অংশ যোগান দিতে পারে। কারণ এসব ফসল যখন উঠবে, তখন পেঁয়াজের দামও বেশি থাকে। ফলে কৃষকও লাভবান হবেন। আবার সারা বছর ধরেই দেশে পেঁয়াজের উৎপাদন, যোগান অব্যাহত থাকবে।"
কিন্তু সংরক্ষণ ক্ষমতা কিছুটা কম হওয়ায় এসব পেঁয়াজের জাত এখনো কৃষকদের কাছে ততটা জনপ্রিয়তা পায়নি। তবে গ্রীষ্মকালীন পেঁয়াজের চাষাবাদ আস্তে আস্তে বাড়ছে বলে কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
আরেকটা পেঁয়াজ হচ্ছে মুড়িকাটা, যেটা অক্টোবরে লাগালে ডিসেম্বর নাগাদ ফসল পাওয়া যায়। কিন্তু এই পেঁয়াজের এখনো অনেক অভাব রয়েছে।
সরকারিভাবে এই বছর সাতশ’ কেজি গ্রীষ্মকালীন পেঁয়াজের বীজ সরবরাহ করা গেছে। কিন্তু কৃষকদের কাছে এই ধরনের বীজের চাহিদা রয়েছে এক লাখ কেজির বেশি।
গ্রীষ্মকালীন পেঁয়াজের দাম বেশি পাওয়ায় কৃষকরা সবই বিক্রি করেন দেন, বীজের জন্য সংরক্ষণ করেন না। আবার সরকারি তরফেও এতো বেশি পেঁয়াজ বীজের চাষ করা সম্ভব হয় না।
"বেসরকারি কোম্পানিগুলোকে এগিয়ে আসতে হবে, সেই সঙ্গে কৃষকদেরও নিজেদের বীজ তৈরি করা শুরু করতে হবে," কর্মকর্তারা বলছেন।

চরের জমি অন্তর্ভুক্ত করা
গবেষকরা বলছেন, বাংলাদেশে বিস্তীর্ণ চর এলাকা রয়েছে। সেসব জমি যদি পেঁয়াজ উৎপাদনে কাজে লাগানো যায়, তাহলেই পেঁয়াজের বাড়তি চাহিদার দশ লাখ টনের পুরোটা উৎপাদন করা সম্ভব।
"তবে সেজন্য পেঁয়াজ উৎপাদনের সমস্যাগুলো সমাধান করতে হবে। তাহলেই কৃষকরা পেঁয়াজ চাষাবাদে আগ্রহী হবেন," বলছে ড. শৈলেন্দ্রনাথ মজুমদার।

সব সমস্যা দূর হলে ঘাটতি মেটাতে কতদিন লাগবে
গবেষকরা বলছেন, পেঁয়াজ চাষাবাদে বীজের অভাব, সংরক্ষণ ব্যবস্থা, দাম নির্ধারণ- ইত্যাদির মাধ্যমে হয়তো একবছরেই রাতারাতি ঘাটতি পূরণ হবে না। কিন্তু সঠিক নীতি ও পরিকল্পনা আর উদ্যোগ কয়েক বছরের মধ্যেই পেঁয়াজের ঘাটতি শূন্যে নামিয়ে আনা সম্ভব।
ড. শৈলেন্দ্রনাথ মজুমদার বলছেন, "দামটা যদি স্থিতিশীল রাখায়, অন্তত উৎপাদন মৌসুমে ৩০ থেকে ৪০ টাকার মধ্যে রাখা যায়, সংরক্ষণ ব্যবস্থা তৈরি করা যায় আর শীতকালীন ও গ্রীষ্মকালীন বীজের পর্যাপ্ত যোগান দেওয়া যায়, তাহলে আগামী পাঁচ-ছয় বছরের মধ্যে আমরা পেঁয়াজ উৎপাদনে পুরোপুরি স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়ে উঠতে পারবো।"
সূত্র : বিবিসি

আরও পড়ুন