‘মানবতাবিরোধী অপরাধে’ আওয়ামী নেতা গ্রেফতার

আপডেট: 07:26:54 21/10/2019



img

তারেক মাহমুদ, কালীগঞ্জ (ঝিনাইদহ) : ঝিনাইদহে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় হলিধানী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি আব্দুর রশিদকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। এসময় তার সহযোগী সাহেব আলীকেও গ্রেফতার করা হয়।
সোমবার বেলা ১২টার দিকে ডাকবাংলা ত্রিমোহিনী থেকে সাদা পোশাকের একদল পুলিশ তাদের গ্রেফতার করে।
গ্রেফতার আব্দুর রশিদ হলিধানী গ্রামের হামেদ আলীর ছেলে। আর সহযোগী সাহেব আলী পাশের কোলা গ্রামের বাসিন্দা।
আটকের সময় আব্দুর রশিদ ডাকবাংলা চালকল মালিক সমিতির নির্বাচন পর্যবেক্ষণ করছিলেন।
ঘটনাস্থলে থাকা হলিধানী ইউনিয়নের মেম্বর মতিয়ার রহমান ও সাগান্না ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান মোজাম্মেল হক বলেন, ‘দুপুরের দিকে সাদা পোশাকের একদল লোক আব্দুর রশিদকে তুলে নিয়ে যায়। আমরা তাদের চিনতে পারিনি।’
আব্দুর রশিদ ও সাহেব আলীকে গ্রেফতারের তথ্য নিশ্চিত করেছেন ঝিনাইদহের পুলিশ সুপার হাসানুজ্জামান।
তিনি জানান, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে দায়ের করা মামলায় গ্রেফতারি পরোয়ানার ভিত্তিতে ওই দুইজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে।
আব্দুর রশিদের বড় ছেলে হারুন অর রশিদ বলেন, ‘কে বা করা আমার বাবাকে ধরে নিয়ে গেছে, তা আমি বলতে পারি না। তবে ঝিনাইদহের বিভিন্ন জায়গায় খুঁজে আমি বাবার সন্ধান পাইনি।’
মুক্তিযোদ্ধা সংসদ ঝিনাইদহ জেলা কমান্ডের সাবেক কমান্ডার মকবুল হোসেন জানান, দুই রাজাকার গ্রেফতার বা মানবতাবিরোধী অপরাধ ট্রাইব্যুনালে কোনো মামলার খবর তিনি জানেন না।
স্থানীয় সূত্রগুলো জানায়, চেয়ারম্যান আব্দুর রশিদ মিয়া হলিধানী ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি এবং বিগত ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে নৌকা প্রতীক পেয়ে নির্বাচিত হন। ২০০৮ সালের নির্বাচনের পর রশিদ মালিতা আওয়ামী লীগে যোগ দেন। এর আগে তিনি নিষিদ্ধঘোষিত একটি দলের সক্রিয় সদস্য ছিলেন।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ২০০৯ সালের ২৫ মার্চ সদর উপজেলার কোলা গ্রামের মুক্তিযোদ্ধা ও সেনাবাহিনীর সাবেক সদস্য আশির উদ্দীন তার এলাকার কথিত ছয় রাজাকারের বিরুদ্ধে ঝিনাইদহ চিফ জুডিশিয়াল ম্যজিস্ট্রেট আদালতে মামলা করেন। যার নম্বর ঝি/সি ৭৯/০৯। বিজ্ঞ আদালত মামলাটি প্রাথমিক অনুসন্ধান করে ঝিনাইদহ সদর থানার ওসিকে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেন। সে সময় সামাজিক ও রাজনৈতিক চাপে মামলাটি আপসরফা করতে বাধ্য হন বলে দাবি করেছিলেন মুক্তিযোদ্ধা আশির উদ্দীন।
অভিযোগপত্রে আশির উদ্দীন উল্লেখ করেন, ‘৭১ সালে আমি জীবনের ঝুঁকি নিয়ে দেশ স্বাধীনের জন্য মুক্তিযোদ্ধাদের সাথে যোগ দিই। এই খবর জানতে পেরে মসলেম উদ্দীন, আব্দুর রশিদ, আলাউদ্দীন, হাকিম আলী খোন্দকার, শাহজাহান, আসমত ও সাহেব আলীসহ ৫০ জন রাজাকার কোলা গ্রামে আমার বাড়ি ঘেরাও করে। আমি ও আমার ভাই মহির উদ্দীন এ সময় কাশিপুর গ্রামের দিকে পালিয়ে যাই। রাজাকাররা আমাদের না পেয়ে বড় ভাই আজিবর মণ্ডল, হবিবার মণ্ডল ও আনসার মণ্ডলকে ধরে নিয়ে ঝিনাইদহ সদর উপজেলার ঘোড়ামারা গ্রামের ব্রিজের নিচে হত্যার পর লাশ গুম করে। আসামিরা এ সময় তাদের পাঁচটি ও পাশের গ্রামের আরো ২৫টি বাড়ি আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে দেয়। রাইফেলের বাট দিয়ে পিটিয়ে আহত করে আমার বৃদ্ধ বাবা দুখি মাহমুদ ও মা কামিনী খাতুনকে।’
মুক্তিযোদ্ধা আশির উদ্দীনের মৃত্যুর পর তার ভাতিজা আনোয়ার হোসেন মানবতাবিরোধী অপরাধ ট্রাইব্যুনালে আরেক দফা অভিযোগ করেন। ৯-১০ মাস আগে মানবতাবিরোধী অপরাধ ট্রাইব্যুনাল থেকে তদন্তে মুক্তিযোদ্ধাদের বাড়িঘর জ্বালিয়ে দেওয়া ও স্বজনদের হত্যার প্রমাণ সংগ্রহ করা হয়।
দেশ স্বাধীনের পর জামায়াত, চরমপন্থী বাম সংগঠন এবং সবশেষে আওয়ামী লীগে যোগ দেন অভিযুক্ত রাজাকার আব্দুর রশিদ। ঝিনাইদহ জেলা আওয়ামী লীগের কতিপয় নেতার আশ্রয়-প্রশ্রয়ে রাতারাতি আওয়ামী লীগার হয়ে নৌকা প্রতীকে ইউপি নির্বাচন করে জয়লাভও করেন।
রশিদের দুই ছেলে হারুন ও বজলুর রশিদও যুবলীগের সঙ্গে যুক্ত। তারাও খুব বেপরোয়া চলাফেরা করেন বলে এলাকাবাসী জানিয়েছে। কথিত আছে, গত দশ বছরে তারা চাঁদাবাজি, ইয়াবা ও অস্ত্র ব্যবসা এবং শালিস-বিচারের নামে সম্পদের পাহাড় গড়ে তুলেছেন। তাদের অত্যাচারে হলিধানী ইউনিয়নের মানুষ অতিষ্ঠ।

আরও পড়ুন