‘স্বাধীন দেশে প্রথম শহিদ শাহাবুদ্দিন-মোহাজ্জেল’

আপডেট: 07:03:37 15/12/2020



img

জিয়াউস সাদাত, খুলনা : ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর। ভোর হতেই চতুর্দিক থেকে আসছে বিজয়ের খবর। সূর্যের আলো ফোটার সাথে সাথে খুলনা নগরীর পাড়া-মহল্লার মোড়ে মোড়ে জটলা। মুক্তিযুদ্ধ শেষ হয়েছে। বিজয় এসেছে, দেশ স্বাধীন হয়েছে-এটাই মূল আলোচনা। একই সঙ্গে নিজেদের ক্ষয়ক্ষতি আর স্বজন হারানোর দীর্ঘশ্বাস।
খুলনা মহানগরীর শেরে বাংলা রোডের হাজিবাড়ি মোড়েও জড়ো হয় পশ্চিম বানিয়াখামার এলাকার যুবক ও তরুণদের একটি গ্রুপ। সেখানে দেশপ্রেমী শেখ শাহাবুদ্দিন বন্দুক ও জাতীয় পতাকা নিয়ে হাজির। তিনি এসেই ঘোষণা দেন দেশ স্বাধীন হয়েছে, এখনই বিজয় মিছিল করতে হবে। বিজয়ের আনন্দ আর বুকভরা উচ্ছ্বাস নিয়ে শুরু হয় মিছিল। গন্তব্য নগরীর ডাকবাংলা মোড়। স্বাধীন বাংলার পতাকা হাতে সগৌরবে মিছিলে নেতৃত্ব দিচ্ছেন শেখ শাহাবুদ্দিন। পাশে বন্দুক হাতে বিএল কলেজের ডিগ্রির ছাত্র নগরীর ফারাজিপাড়া এলাকার মোহাজ্জেল হোসেন। মুক্তির আনন্দ আর উচ্ছ্বাসে ডানা মেলে উড়তে চান তারা।
উচ্চস্বরে ‘জয় বাংলা’ স্লোগানে মিছিলটি ফারাজিপাড়া পার হয়ে খানজাহান আলী রোডে ওঠে। সকালের সূর্যের তেজোদীপ্ত রোদ আর আলোর ঝলকানি। ততক্ষণে স্লোগানে স্লোগানে প্রকম্পিত হচ্ছে বিহারি অধ্যুষিত আশপাশের এলাকা। মুক্তিপাগল মানুষের বিজয় মিছিল খানজাহান আলী রোড ধরে এগিয়ে চলেছে ফেরিঘাট মোড়ের দিকে। জামাতখানা পার হয়ে বর্তমান মুক্তিযোদ্ধা সংসদের সামনে আসামাত্র দুই পাশ থেকে বৃষ্টির মতো গুলি। আর শত শত ধারালো অস্ত্রের ঝলকানি। স্থানীয় বিহারি ও রাজাকারদের দুটি গ্রুপ গুলি করতে করতে এগিয়ে আসে। প্রাণভয়ে মিছিলকারীরা যে যার মতো পালিয়ে যান। উপর্যুপরি গুলিতে ঝাঁঝরা হয়ে যান শেখ শাহাবুদ্দিন ও মোহাজ্জেল হোসেন। বিজয় দিবসের প্রথম সকালে তাদের বুকের তাজা রক্তে রঞ্জিত হয় খুলনার রাজপথ। এরপর ওই রাজপথেই ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে টুকরো টুকরো করা হয় এ দুই মুক্তিকামীর নিথর দেহ। কয়েকশ’ বিহারি ওই রাস্তার ওপর তাদেরকে কেটে টুকরো টুকরো করে উল্লাস করতে থাকে।
মুহূর্তেই এ সংবাদ ছড়িয়ে পড়ে নগরজুড়ে। বিজয়ের আনন্দ-উচ্ছ্বাস নিমিষে উবে যায়। আতংকগ্রস্ত হয়ে পড়েন সাধারণ মানুষ। স্বজন হারানোর বেদনায় কান্নার রোল পড়ে যায় পশ্চিম বানিয়াখামার এলাকায়। খবর পেয়ে বীর মুক্তিযোদ্ধা খিজির আলী (বীর বিক্রম) ছুটে আসেন ওই বাড়িতে। তিনি পরিবারের সদস্যদের শান্ত্বনা দেন।
এরপর পার হয়েছে ৪৯টি বছর। কেউ কখনো খবর নেয়নি এ দুই মুক্তিকামীর পরিবারের। অযত্ন-অবহেলায় বড় হয়েছেন শাহাবুদ্দিনের দুই সন্তান। পাননি কোনো রাষ্ট্রীয় সহযোগিতা কিংবা স্বীকৃতি। বিনা চিকিৎসায় মৃত্যু হয়েছে শাহাবুদ্দিনের বড় ছেলে শেখ আলাউদ্দিনের। আর বেঁচে থাকার চেষ্টায় লড়াই করে যাচ্ছেন অপর ছেলে শেখ সালাউদ্দিন।
১৬ ডিসেম্বরের প্রথম সকালে সেই বিজয়মিছিলে অংশ নেওয়া সোলাইমান হাওলাদার স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে বলেন, ‘শাহাবুদ্দিন ভাই অত্যন্ত সাহসী মানুষ ছিলেন। ওই সময় নগরীর সবাই তাকে এক নামে চিনতো। তিনি সকালে এসে সকলকে খবর দেন দেশ স্বাধীন হয়ে গেছে। চলো আমরা ডাকবাংলা মোড় পর্যন্ত বিজয় মিছিল করবো। এরপর দশ কেজি গরুর মাংস রান্না করে মিছিলকারীদের খাওয়ানো হবে। দেশ স্বাধীনের খবরে সবাই স্বতঃস্ফুর্তভাবে মিছিলে অংশ নেয়। গলা ফাটিয়ে সবাই জয় বাংলার স্লোগানে প্রকম্পিত করছিল আশপাশ। কিন্তু জামাতখানা এবং ফেরিঘাট এলাকায় ছিল সব বিহারিদের বাস। ওখানে ছিল তাদের শক্ত ঘাঁটি। মিছিলটি জামাতখানা পার হওয়ার সাথে সাথে তারা গুলি শুরু করে। গুলিবিদ্ধ হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে শাহাবুদ্দিন ভাই ও মোহাজ্জেল। আমরা দৌড়ে শিরিসনগরের মধ্য দিয়ে জীবন নিয়ে পালিয়ে আসি।’ স্মৃতিচারণ করতে করতে কান্নায় ভেঙে পড়েন বৃদ্ধ সোলায়মান হাওলাদার।  
কথা হয় নগরীর পশ্চিম বানিয়াখামার এলাকার গোলাম মহম্মদের ছেলে শেখ শাহাবুদ্দিনের ছোট ভাই শেখ জিন্নাত আলীর (খোকন) সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘স্বাধীন বাংলাদেশে খুলনার প্রথম শহীদ আমার ভাই শাহাবুদ্দিন। বিহারিরা ১৬ ডিসেম্বর সকালে বিজয় মিছিলে হামলা করে আমার ভাইকে নৃশংসভাবে হত্যা করে।’
তিনি আরো বলেন, বীর মুক্তিযোদ্ধা খিজির আলী (বীর বিক্রম) ছিলেন শাহাবুদ্দিনের ঘনিষ্ঠ বন্ধু। ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ নগরীর বৈকালী এলাকায় পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর সঙ্গে প্রতিরোধ যুদ্ধে খিজির আলীর সঙ্গে শাহাবুদ্দিন অংশ নেন। পরে খিজির আলী তাকে ট্রেনিংয়ে যেতে বললেও তিনি এলাকা ছেড়ে যাননি। স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধাদের বিভিন্ন ধরনের সহযোগিতা করাই ছিল যুদ্ধকালীন নয় মাস তার প্রধান কাজ।
তিনি জানান, ১৯৭১ এর ৪ এপ্রিল খুলনা বেতার কেন্দ্র দখলের যুদ্ধে সুবেদার মেজর জয়নুল আবেদিনের সঙ্গে শাহাবুদ্দিন সরাসরি যুদ্ধে অংশ নেন। ওই যুদ্ধে সুবেদার মেজর জয়নুল আবেদিন শহিদ হলে পশ্চিম বানিয়াখামার এলাকার বর্তমান সিটি কলেজ হোস্টেল কম্পাউন্ডে তাকে সমাহিত করার বিষয়ে শেখ শাহাবুদ্দিন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। ওই যুদ্ধে আহত অন্যদের চিকিৎসার দায়িত্বও পালন করেন শাহাবুদ্দিন।
তিনি শাহাবুদ্দিনের আত্মত্যাগের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি দাবি করেন।  
শেখ শাহাবুদ্দিনের ছোট বোন বেগম জাহান আরা বলেন, ‘ওই দিন খুব ভোরে শাহাবুদ্দিন বাড়ি আসে। এসেই জানায়, দেশ স্বাধীন হয়েছে। তিনি খুব দ্রুত পতাকা এবং বন্দুক নিয়ে বের হয়ে যান। কিন্তু আর ফিরে আসেনি...।’
খুলনা সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র বীর মুক্তিযোদ্ধা মনিরুজ্জামান মনি বলেন, ‘যুদ্ধ থেকে ফিরে আমি শাহাবুদ্দিন শহিদ হওয়ার খবর পাই। ওই দিনই আমি তাদের বাড়িতে যাই এবং স্বজনদের সমবেদনা জানাই।’
শাহাবুদ্দিনের শহিদ হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়া উচিত ছিল বলেও তিনি মনে করেন।
মুক্তিযুদ্ধের ৪৯ বছর পরও এ পরিবারের পাশে কেউ দাঁড়ায়নি, মনে রাখেনি মুক্তিকামী শাহাবুদ্দিন এবং মোহাজ্জেল হোসেনকে।

আরও পড়ুন