ভবদহ নিয়ে সেমিনারে তোপের মুখে পাউবো

আপডেট: 09:02:53 25/09/2021



img

স্টাফ রিপোর্টার: ভবদহের জলাবদ্ধতা নিরসনে উদ্ভাবনী উদ্যোগে পাইলটিং কার্যক্রম নিয়ে সেমিনারে তোপের মুখে পড়েছেন পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তারা। শনিবার যশোরের জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে এই সেমিনারের আয়োজন করে পানি উন্নয়ন বোর্ড।
শনিবার সেমিনারে অংশগ্রহণকারী জলাবদ্ধতার শিকার ওই অঞ্চলের প্রতিনিধিরা অভিযোগ করেন, পানি উন্নয়ন বোর্ড সম্পূর্ণ উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে সরকারের সাথে সাধারণ মানুষের বিভেদ ও দূরত্ব তৈরি করছে। কেবলমাত্র লুটপাটের উদ্দেশে তারা এই অঞ্চলের মানুষকে ‘গিনিপিগ’ হিসেবে ব্যবহার করছে।  
ভবদহ পানি নিষ্কাশন সংগ্রাম কমিটির নেতারা দাবি উত্থাপন করেন, বিলকপালিয়ায় টাইডাল রিভার ম্যানজেমেন্ট (টিআরএম) এবং পানি নিষ্কাশনে সেখানকার আমডাঙ্গা খাল প্রশস্ত ও সংস্কার করতে হবে। সেক্ষেত্রে এই দুই অঞ্চলের বাসিন্দাদের ক্ষতিপূরণ দিতে হবে।  
তারা অভিযোগ করেন, দেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যখন বলেছেন- নদী বাঁচলে দেশ বাঁচবে; ঠিক সেই সময়ে আমলারা ভবদহ অঞ্চলের নদীগুলোকে মেরে ফেলার জন্যে নানা রকমের কায়দা করছে। ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের কল্যাণে, এই অঞ্চলের দুঃখ ভবদহের পানি নিষ্কাশনে সেচ পাম্প ব্যবহার করছে। এই সেচ পাম্প ব্যবহারে পানি অপর প্রান্তে ফেলা হলেও তা আবারও ফিরে আসছে। ভবদহকে কেন্দ্র করে লুটপাটের একটা আখড়া করা হয়েছে বলে নেতারা মত প্রকাশ করেন।    
যশোরের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মো. রফিকুল হাসানের সভাপতিত্বে সেমিনারে প্রধান অতিথি ছিলেন পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের চিফ ইনোভেশন অফিসার (যুগ্ম সচিব) মো. আজাদুর রহমান মল্লিক। বিশেষ অতিথি ছিলেন পানি উন্নয়ন বোর্ডের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী একেএম তাহমিদুল ইসলাম, যশোর সার্কেলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী পীযূষকৃষ্ণ কুণ্ডু। প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন পানি উন্নয়ন বোর্ডের যশোরের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. তাওহীদুল ইসলাম।
সেমিনারে ভবদহ পানি নিষ্কাশন সংগ্রাম কমিটির উপদেষ্টা ইকবাল কবির জাহিদ বলেন, ভবদহ অঞ্চলের মানুষ কপালপোড়া। প্রধানমন্ত্রী যেখানে বলছেন, নদী বাঁচলে দেশ বাঁচবে, সেখানে পানি উন্নয়ন বোর্ড উল্টো পথে হাঁটছেন। তারা ভবদহ এলাকার সব নদীগুলোকে মেরে ফেলেছেন। এখানকার মানুষকে বাঁচাতে হলে টিআরএম ছাড়া আর কোনও উপায় নেই। বিলকপালিয়া থেকে টিআরএম বাস্তবায়ন শুরু করতে হবে। একইসাথে আমডাঙ্গা খাল খনন করতে পারলে ভবদহ অঞ্চলের মানুষ জলাবদ্ধতার হাত থেকে রেহাই পাবে। কিন্তু তা না করে পানি উন্নয়ন বোর্ড লুটপাটের প্রকল্প নিচ্ছে। কোনও অনিয়মের তদন্ত হয় না।
মণিরামপুর উপজেলার কুলটিয়া ইউপি চেয়ারম্যান শেখরচন্দ্র বলেন, ‘গত চার বছর ধরে আমাদের গ্রামে পানির কারণে ফসল হচ্ছে না। নদীকে শাসন নয়, নদীকে তার নিজস্ব গতিতে চলতে দিতে হবে।’
ভবদহ পানি নিষ্কাশন সংগ্রাম কমিটির আহ্বায়ক রণজিৎ বাওয়ালি বলেন, পানি উন্নয়ন বোর্ড জনগণ ও সরকারকে মুখোমুখী অবস্থানে দাঁড় করিয়ে দিচ্ছে। খনন করে নদী বাঁচানো যায় না। প্রবাহ নিশ্চিত করেই কেবল নদী বাঁচানো সম্ভব। পাঁচ বছর ধরে কেবল নদী খনন করা হচ্ছে। এতে নদীর অবস্থা আরও খারাপ হয়েছে। আর সেচযন্ত্র দিয়ে পানি সেচে ভবদহের জলাবদ্ধতা দূরীকরণ একটি অবাস্তব এবং হাস্যকর বিষয়। ভবদহকে বাঁচাতে হলে টিআরএম বাস্তবায়ন করতে হবে। এটা না করে বড় বড় প্রকল্প নেওয়া হচ্ছে, নদী খননের নামে অর্থ লুটপাটের ব্যবস্থা করা হচ্ছে। জনগণের দাবি মেনে এবং জনগণকে সঙ্গে নিয়ে কাজ না করলে এই এলাকা জলাবদ্ধতামুক্ত এবং বিরান হওয়া থেকে রক্ষা পাবে না।
ভবদহ পানি নিষ্কাশন আন্দোলন কমিটির আহ্বায়ক এনামুল হক বাবুল বলেন, আগামী ডিসেম্বর মাসের মধ্যে টিআরএম বাস্তবায়ন শুরু না হলে কঠোর আন্দোলন গড়ে তোলা হবে। পানি উন্নয়ন বোর্ড গত ৪০ বছর ধরে জনগণের সাথে প্রতারণা করছে। তারা কত টাকা খরচ করছে তার হিসাব কেউ নেয় না। তাদের তামাশার কারণে আবারও ২০০ গ্রামের দশ লাখ মানুষ জলাবদ্ধতার শিকার হতে চলেছেন। ফসলের জমি, বসতভিটা- সবই কেড়ে নিয়েছে পানি। সরকার বারবার প্রকল্প গ্রহণ করে, কিন্তু জলাবদ্ধ মানুষের কোনও উপকার হয় না।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি বলেন, ‘সরকারের ডেল্টাপ্ল্যানে টিআরএম বাস্তাবায়নের কথা উল্লেখ রয়েছে। যেকারণে এটি বাতিল হবে না। আমরা জনগণের সাথে পানি উন্নয়ন বোর্ডোর দূরত্ব দূর করতে উদ্যোগী হয়েছি। আগামীতে যে প্রকল্প নেওয়া হবে, সেটি জনগণের মতামতের ভিত্তিতেই করা হবে।’
যশোরের অভয়নগর, মণিরামপুর ও কেশবপুর উপজেলা এবং খুলনার ডুমুরিয়া ও ফুলতলা উপজেলার অংশবিশেষ নিয়ে ভবদহ অঞ্চল।  এলাকার ৫২টি বিলের পানি ওঠানামা করে মুক্তেশ্বরী, টেকা, শ্রী ও হরি নদী দিয়ে। পলি পড়ে নদীগুলো নাব্য হারিয়েছে। ফলে নদী দিয়ে পানি নিষ্কাশিত হচ্ছে না। এই অবস্থায় বৃষ্টির পানিতে এলাকার বিলগুলো প্লাবিত হয়েছে। বিল উপচে পানি ঢুকেছে বিলসংলগ্ন গ্রামগুলোতে। ইতোমধ্যে অভয়নগর ও মণিরামপুর উপজেলার ৮০টি গ্রাম পানিতে তলিয়ে গেছে। দ্রুত টিআরএম বাস্তবায়ন না করলে অসংখ্য বাড়িঘর, রাস্তাঘাট, মাছের ঘের, শিক্ষা ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান আবারও পানির নিচে চলে যাবে বলে স্থানীয় প্রতিনিধিরা জানান।

আরও পড়ুন