ঈদে সাতক্ষীরার প্রায় তিন লাখ পরিবার চাল পাচ্ছে

আপডেট: 01:51:39 16/07/2021



img

আব্দুস সামাদ, সাতক্ষীরা : আসন্ন ঈদুল আজহা উপলক্ষে সাতক্ষীরা জেলায় দুই লাখ ৮৭ হাজার ৩৪০টি দুস্থ পরিবারকে খাদ্য সহায়তা দিচ্ছে সরকার। অতিদরিদ্রদের সামাজিক নিরাপত্তাবেষ্টনী কার্যক্রম 'ভালনারেবল গ্রুপ ফিডিং' বা ভিজিএফ কর্মসূচির আওতায় প্রতি পরিবারকে দেওয়া হচ্ছে দশ কেজি করে চাল। চাল বিতরণ কার্যক্রম ইতোমধ্যে শুরু করা হয়েছে। শেষ করতে হবে ঈদের আগেই। গত ঈদুল ফিতরে চালের পরিবর্তে সমসংখ্যক পরিবারকে ৪৫০ টাকা করে দেওয়া হয়েছিল।
২০১৩ সালের পরিসংখ্যান মতে, জেলায় মোট পরিবারের সংখ্যা তিন লাখ ৬২ হাজার ৫৮৯টি। এর থেকে দুই লাখ ৮৭ হাজার ৩৪০টি দুস্থ পরিবারকে খাদ্য সহায়তা দিচ্ছে সরকার। জেলায় দারিদ্র্যের হার দেখানো হয়েছে ২৫.১%। এর মধ্যে অতিদরিদ্রের হার ১২.৫%। সে হিসেবে জেলার দরিদ্র পরিবার ভিজিএফ পাওয়ার পর 'মধ্যবিত্ত' পবিবারও এই কর্মসূচির আওতাভুক্ত থাকবে। এমনকি শ্যামনগর ও আশাশুনি উপজেলার কোনো পরিবারই এই কর্মসূচি থেকে বাদ যাওয়ার কথা না।
এদিকে, বিভিন্ন ইউনিয়নে এ চাল বিতরণে অনিয়মের অভিযোগ উঠছে। কয়েকটি ইউনিয়নে চালের সঠিক মাপ না দিয়ে প্লাস্টিকের বালতিতে মেপে দেওয়া হচ্ছে। এতে আট কেজি থেকে সাড়ে নয় কেজি করে চাল পাচ্ছেন কার্ডধারীরা। আবার শ্যামনগর ও আশাশুনি উপজেলার অনেক পরিবার আম্পান, বুলবুল, ফণী, ও ইয়াস ঝড়ের কারণে বাড়িঘর হারিয়ে জীবন বাঁচাতে সাতক্ষীরা শহরসহ বিভিন্ন অঞ্চলে ঘর ভাড়া নিয়ে বসবাস করছে। তারা পৌর এলাকার ভোটার না হওয়ায় পাচ্ছেন না ভিজিএফ সহায়তা। নিজ এলাকায় ভিজিএফের তালিকায় নাম থাকলেও সেখান থেকে চাল আনতে পারেছেন না। এদের খুঁজে বের করে এ সুবিধার আওতাভূক্ত করা জরুরি বলে মনে করেন সাতক্ষীরা জেলার নাগরিক কমিটি।
জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা জানান, জেলার সাতটি উপজেলায় ৭৮টি ইউনিয়ন ও দুটি পৌরসভায় দুই লাখ ৮৭ হাজার ৩৪০টি দুস্থ পরিবারকে দশ কেজি করে ভিজিএফের চাল দেওয়া হবে। এর মধ্যে সাতক্ষীরা সদর উপজেলায় ২৪ হাজার ৭৬৬টি পরিবার, কলারোয়ায় ১২ হাজার ৫৭৪, তালায় ১৫ হাজার ৮৬৫, আশাশুনিতে ৫৯ হাজার ৫৫৮, দেবহাটায় ২০ হাজার ৬৭৮, কালিগঞ্জে ৬৬ হাজার ২২০ এবং শ্যামনগর উপজেলায় ৭৯ হাজার ৯৭৭টি পরিবারকে ভিজিএফের চাল দেওয়ার কথা। এছাড়াও সাতক্ষীরা পৌরসভায় চার হাজার ৬২১টি পরিবার এবং কলারোয়া পৌরসভায় তিন হাজার ৮১ পরিবারকে ভিজিএফের আওতায় রয়েছে।
শ্যামনগর উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা জানান, শ্যামনগর উপজেলায় মোট পরিবার রয়েছে ৮২ হাজার। ঈদে ভিজিএফ সহায়তা পাচ্ছে প্রায় ৮০ হাজার পরিবার। বাকি থাকবে মাত্র দুই হাজার পরিবার। তবে ২০১১ সালের পরিসংখ্যান অনুযায়ী শ্যামনগর উপজেলায় মোট পরিবার সংখ্যা ৭২ হাজার ২৭৯টি। সর্বশেষ সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী শ্যামনগর উপজেলার জনসংখ্যা তিন লাখ ১৮ হাজার ২৫৪।
ইতোমধ্যে করোনার কারণে শ্যামনগর উপজেলায় ২৩ টন চাল ও ১৬ লাখ টাকা বিতরণ করা হয়েছে। ভিজিএফ শুরুর আগে এ টাকা ও চাল বিতরণ করা হয়। ভিজিএফ শুরু হওয়ার পর এ কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। ঈদের পরে এ কার্যক্রম আবার চালু করা হবে। এছাড়াও ৩৩৩ নাম্বারে কল পেয়ে ৬০ থেকে ৬৫টি পরিবারকে দেওয়া হয়েছে খাদ্য সামগ্রী। যারা করোনাসহ অন্যান্য সহায়তা পেয়েছে, তাদের সাধারণত ভিজিএফ সহায়তা দেওয়া হয় না।
অপরদিকে, আশাশুনি উপজেলায় ২০১১ সালের সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী বসবাসকারী মোট পরিবারের সংখ্যা ৬২ হাজার ৩৭টি। এবার আশাশুনি উপজেলায় ভিজিএফ-এর চাল পাবে ৫৯ হাজার ৫৫৮টি পরিবার। ইতোমধ্যে করোনা প্রণোদনা ও অন্যান্য সহায়তা পেয়েছেন অনেকে। ফলে এই উপজেলারও কোনো পরিবারের সরকারি সহায়তা থেকে বঞ্চিত হওয়ার কথা না।
তবে, আশাশুনির আনুলিয়া ইউপি চেয়ারম্যান আলমগীর আলম লিটন বলেন, তার ইউনিয়নে পরিবার রয়েছে প্রায় আট হাজার। নদী ভাঙন, কর্মহীনতাসহ নানা কারণে এখানে দরিদ্রের সংখ্যা বেশি। কিন্তু সে তুলনায় তারা ভিজিএফের কার্ড পেয়েছেন মাত্র পাঁচ হাজার ২০০টি। এখানে আরও তিন হাজার পরিবারকে এ কর্মসূচির আওতায় নেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। যদিও ২০১১ সালের আদম শুমারির রিপোর্ট অনুযায়ী দেখা যায়, আনুলিয়ায় বসবাসকারী মোট পরিবার সংখ্যা পাঁচ হাজার ৫০৮টি।
সাতক্ষীরা জেলা পরিসংখ্যান অফিসের উপ-পরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) মো. বছির উদ্দিন জানান, ২০১৩ সালের পরিসংখ্যান অনুসারে জেলায় মোট পরিবার রয়েছে তিন লাখ ৬২ হাজার ৫৮৯টি। এ জেলায় দারিদ্র্যের হার ২৫.১%। এর মধ্যে অতি দরিদ্র ১২.৫%। সরকারি পরিসংখ্যানে আরও জানা যায়, ২০১১ সালের আদম শুমারির রিপোর্ট অনুযায়ী সারাদেশে জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার ছিল ১ দশমিক ৪৭ শতাংশ। সেখানে খুলনা বিভাগে শূন্য দশমিক ৬৪ শতাংশ এবং সাতক্ষীরা জেলায় শূন্য দশমিক ৬২ শতাংশ। এর দশ বছর আগে ২০০১ সালে যা ছিল ১ দশমিক ৫৬ শতাংশ। ইতোমধ্যে আয়লা, আম্পান, ইয়াসসহ বিভিন্ন ঘূর্ণিঝড়, নদীর বেড়িবাঁধ ভাঙন এবং জলাবদ্ধতার কারণে এই জেলার বিপুল সংখ্যক মানুষ অন্য জায়গায় চলে গেছেন। ফলে বর্তমান সময়ে জনসংখ্যা বৃদ্ধির পরিবর্তে কমে যাওয়ারই আশংকা করা হয় বিভিন্ন মহল থেকে।
সাতক্ষীরা জেলা নাগরকি কমিটির আহ্বায়ক আনিসুর রহিম বলেন, শ্যামনগর ও আশাশুনি উপজেলার অনেক দরিদ্র পরিবার প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে এলাকা ছেড়ে সাতক্ষীরা পৌর এলাকার বিভিন্ন অঞ্চলে বসবাস করছে। তারা গ্রামের কার্ডধারী হওয়ায় পৌর এলাকা থেকে ভিজিএফ সুবিধা পাচ্ছে না। আবার নিজ এলাকা থেকেও ভিজিএফের চাল উত্তোলন করতে পারছে না। এদেরকে খুঁজে বের করে ভিজিএফের চাল পৌঁছে দেওয়া উচিত।
স্থানীয় সরকার বিভাগের উপ-পরিচালক মো. তানজিল্লুর রহমান বলেন, আসন্ন ঈদুল আজহা উপলক্ষে সাতক্ষীরা জেলায় দুই লাখ ৮৭ হাজার ৩৪০টি দুস্থ পরিবারকে ভিজিএফ কর্মসূচির আওতায় খাদ্য সহায়তা দিচ্ছে সরকার। ইতোমধ্যে কার্যক্রম শুরু করা হয়েছে। এ বিষয়ে সকল প্রকার স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে উপজেলা নির্বাহী অফিসারদের নির্দেশনা প্রদান করা হয়েছে। কোনো প্রকার অনিয়ম পেলে কঠোর ব্যবস্থা প্রহণ করা হবে।

আরও পড়ুন