অকুতোভয় করোনাযোদ্ধা অ্যাম্বুলেন্স-চালক টিপু

আপডেট: 07:30:58 23/06/2020



img

তারেক মাহমুদ, কালীগঞ্জ (ঝিনাইদহ) : ‘করোনা রোগী বহনের কাজ শেষ করে গাড়ি পরিষ্কার করে পোশাক পুড়িয়ে রাতে বাড়ি ফিরি। রাতে ঘুম আসতে চায় না। করোনার বিভীষিকা, রোগীদের আতঙ্ক, অস্থিরতা আর মৃত্যুভয়ে কাতর মানুষের মুখগুলো চোখের সামনে ভাসে। ভীষণ কষ্ট লাগে, মনটা বিষণ্ন হয়ে ওঠে। এসব কথা ভাবতে ভাবতে ভেঙে পড়ি, মনে হয় আমি স্ট্রোক করবো। তখন পরিবারের সদস্যরা আমাকে সাহস দেয়।’
এভাবেই বলছিলেন ঝিনাইদহ সদর হাসপাতালের অ্যাম্বুলেন্স-চালক টিপু সুলতান। তিনি ২৯ বছর ধরে এই অ্যাম্বুলেন্স চালাচ্ছেন।
টিপুর ভাষ্য, ‘করোনার দুর্যোগ মুহূর্তে যখন মুমূর্ষু রোগীর আর্তচিৎকারে কেউ এগিয়ে আসে না, তখন জীবনের ঝুঁকি নিয়ে এগিয়ে আসে অ্যাম্বুলেন্স-চালক। আক্রান্তদের একেবারে কাছে গিয়ে সেবা দিয়ে থাকি আমরাই। নিজের জীবনের তোয়াক্কা না করে অনেকের জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে বেঁচে থাকার স্বপ্ন দেখায় এই অ্যাম্বুলেন্স চালকরাই।’
টিপু বলেন, ‘ঝিনাইদহে করোনাভাইরাস আক্রান্ত প্রথম রোগী শনাক্ত হওয়ার পর অফিস আমাকে চিঠি দেয়। বলা হয়, আমাকে করোনা আক্রান্ত রোগী বহন করতে হবে। এতে আমি মানসিকভাবে কিছুটা ভেঙে পড়ি। তখন পরিবারের সদস্যরা আমাকে সাহস দেয়। একদিকে আমার স্ত্রী-সন্তানের জীবন-মৃত্যুর প্রশ্ন, অন্যদিকে দায়িত্ব। মন শক্ত করি, দায়িয়ত্বের প্রশ্নে পিছু-পা না হওয়া শপথ করি। তার পর প্রতিদিনের মতো করোনাকালেও সকাল হলে ফ্রেশ হয়ে নামাজ পড়ে নাস্তা শেষ করে সাড়ে নয়টার মধ্যে হাসপাতালে পৌঁছে যাই। এরপর অপেক্ষায় থাকি কখন বেজে উঠবে ফোন। ফোন বাজলে গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে পড়ি করোনা আক্রান্ত রোগীর বাড়ির উদ্দেশে।’
‘করোনায় আক্রান্ত রোগীর কাছে ছুটে গিয়ে বাড়ি থেকে তাকে হাসপাতালে আনি। এসময় দেখি রোগীর পরিবারের সদস্যরা কেউ তার পাশে নেই। অসহায় অবস্থায় ঘরের এক কোণে মুখ লুকিয়ে বসে থাকে রোগী। তার প্রতিবেশি, আত্মীয়-স্বজন সবাই বলে রোগীকে দ্রুত গ্রাম থেকে নিয়ে যান, দেরি করেন না। ওর জন্য আমরা সবাই মারা যাব। সে সময়টা এতটাই কষ্টকর যে আপনাকে বোঝাতে পারবো না।’
এভাবেই নানা তিক্ত অভিজ্ঞতার মধ্যে দিয়ে এ পর্য়ন্ত প্রায় ১৫ জন রোগীকে অ্যাম্বুলেন্সে বহন করে হাসপাতালে এবং বাড়িতে পৌঁছে দিয়েছেন টিপু।
তিনি জানান, রোগীদের একেবারে কাছে গিয়ে সেবা দেওয়ায় তিনি নিজের করোনা নমুনা পরীক্ষা করিয়েছেন। নেগেটিভ রিপোর্ট এসেছে।
টিপু ছোটবেলা থেকেই কাজপাগল মানুষ। কোনো কাজেই তিনি ভয় পান না। আল্লাহর ওপর ভরসা রেখে মনে শক্তি নিয়ে মানুষের সেবায় রত আছেন। প্রতিদিন সকাল থেকে রাত পর্যন্ত কাজের মধ্যেই থাকেন তিনি।
অকুতোভয় এই ব্যক্তি বলেন, ‘‘এই কাজ করায় এলাকাবাসী আমাকে দেখে ভয় পায়। এমনকি আমি অফিস রুমে গেলেও স্টাফরা আমাকে বলে, ‘আপনি এখানে এসেছেন কেন? বাইরে যান।’ এসব কথা শুনে তখন খুব খারাপ লাগে। ভাবি, কাদের জন্য এতকিছু করছি? তবে আমার পরিবার আমাকে সাহস যোগায়। তারা কখনো আমাকে দেখে ভয় পায় না। তারা বলে, মরলে একসাথে মরবো আর বাঁচলে একসাথে বাঁচব। তারপরও স্ত্রী-সন্তান আমাকে নিয়ে চিন্তায় দিন পার করে।’
তিনি বলেন, ‘দিনের একটা বড় সময় করোনা আক্রান্ত রোগীদের কাছাকাছি থাকি। কিন্তু কোনো ডাক্তার আমাকে বলেনি, রোগী বহন করার পর গাড়িটা কীভাবে জীবাণুমুক্ত করতে হবে। কীভাবে নিজের নিরাপত্তা বজায় রেখে কাজ করতে হবে। তাই আমি নিজে নিজেই সাবান ব্লিচিং পাউডার পানিতে মিশিয়ে মিশ্রণ তৈরি করে গাড়ি পরিষ্কার করি।’
‘তবে সবচেয়ে খারাপ লাগে দিনশেষে যখন চিকিৎসক ও নার্সদেরই ধন্যবাদ জানানো হয়। আমার মতো বা অন্য ছোট পদে যারা আছেন, এই করোনা সংক্রমণ প্রতিরোধে তারাও তো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন। তাদের কেউ ধন্যবাদ দেয় না।’
ঝিনাইদহ সদর হাসপাতালের মেডিকেল অফিসার ডাক্তার রিমন পারভেজ বলেন, ‘টিপু অনেক বুদ্ধিসম্পন্ন মানুষ। তিনি অন্যদের মতো কাজ দেখে ভয় পান না। করোনা আক্রান্ত রোগীর খবর জানার সাথে সাথে তার বাড়িতে চলে যেতে প্রস্তুত হন। এই করোনার সময়ে তিনি যে সার্ভিস দিচ্ছেন, তাতে টিপুকে ধন্যবাদ দিলেও ছোট করা হবে।’

আরও পড়ুন