চিত্রায় স্বেচ্ছাশ্রমে সেতু, স্বস্তিতে দশ গ্রামের মানুষ

আপডেট: 06:44:10 08/04/2021



img
img

চন্দন দাস, বাঘারপাড়া (যশোর) : বাঘারপাড়া আর মাগুরার শালিখা উপজেলার দশ গ্রামের মানুষের নদী পারাপারের দুর্দশা এবার লাঘবের পথে। ঝুঁকি নিয়ে তাদের বাঁশের সাঁকো পার হওয়ার দিন শেষের পথে।
এই অঞ্চলের মানুষ তাদের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় চিত্রা নদীর পরে একটি কংক্রিটের সেতু নির্মাণে কাজ শুরু করেছেন।
স্বাধীনতা পরবর্তী সময় নৌকা ও আশির দশক থেকে সাঁকোই ছিল এখানকার মানুষের নদী পারাপারে একমাত্র উপায়। একটি সেতু নির্মাণে জনপ্রতিনিধিদের আশ্বাসেই কেটে গেছে বহু বছর। কিন্তু মেলেনি কিছুই, এমনকী সরকারি কোনো সহায়তাও।
এবার তাদের নিজেদের অর্থায়ন আর স্বেচ্ছাশ্রমে নদীর ওপর নির্মিত হচ্ছে একটি কংক্রিটের সেতু। যার দৈর্ঘ্য ১৩০ ফুট ও প্রস্থ ৬ ফুট। সেতুর নির্মাণ কাজ শেষ হলে নদী পাড়ের হাজারো মানুষের দীর্ঘ সময়ের আক্ষেপ ও অপেক্ষার অবসান ঘটবে।
বিরল এই দৃষ্টান্তটি স্থাপন করেছেন যশোরের বাঘারপাড়া উপজেলা ও মাগুরার শালিখা উপজেলার প্রায় ১০ গ্রামের মানুষ।
সম্প্রতি সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, বাঘারপাড়া উপজেলার খানপুর বাজার সংলগ্ন চিত্রা নদীতে একটি সেতুর নির্মাণ কাজ শুরু হয়েছে। বর্তমানে মাটি তুলে সেতুর দুই পারে নদীর পাড় বাঁধার কাজ চলছে। কংক্রিটের এই সেতু নির্মাণে প্রায় দশ লাখ টাকা ব্যয় হতে পারে। অনুদান হিসেবে খানপুর বাজার কমিটি প্রয়োজনীয় সিমেন্ট, খানপুর মাধ্যমিক বিদ্যালয় এক লাখ টাকা, প্রধান শিক্ষক পঞ্চাশ হাজার, খানপুর গ্রামের সেলিম রেজা ত্রিশ হাজার, দাখিল মাদরাসা এক লাখ টাকা দিয়েছেন। এছাড়া শালিখা উপজেলার হরিশপুর    গ্রামবাসী একলাখ টাকা দিয়েছেন এবং আরও সহযোগিতা করবেন বলে জানিয়েছেন।
স্থানীয়রা জানান, খানপুর বাজারে সপ্তাহের প্রতি শুক্র ও সোমবার হাট বসে। স্বাধীনতা পরবর্তী সময় থেকে বাজার সংলগ্ন চিত্রার পাড়ে নির্মিত বাঁশের সাঁকোই ছিল নদীর দু’পাড়ের বাসিন্দাদের পারাপারের একমাত্র ভরসা। প্রতিবছর তাদের শ্রম ও চাঁদার টাকায় বাঁশ-খুঁটি কিনে সাঁকো নির্মাণ ও সংস্কার করা হয়। নদীর ওপারে শালিখা উপজেলার কয়েক   গ্রামের কৃষক তাদের উৎপাদিত ফসল এই হাটে বিক্রি করতে আসে। প্রায় পাঁচ শতাধিক শিক্ষার্থীসহ প্রতিদিন হাজারো মানুষের যাতায়াত করতে হতো নড়বড়ে ঝুঁকিপূর্ণ এই সাঁকো দিয়েই।
দেশ স্বাধীনের পরপরই খানপুর বাজারের সৃষ্টি হয়। আশির দশকে এসে বাজারের দক্ষিণে প্রাইমারি, হাইস্কুল ও মাদরাসাসহ তিনটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠে।
সেতু নির্মাণের মূল উদ্দ্যোক্তা খানপুর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সহকারী   প্রধান শিক্ষক শহিদুল ইসলাম বলেন, স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের কাছে একটি সেতুর জন্য বহুবার ধর্ণা দিয়েও লাভ হয়নি। এমনকী তারা সাঁকো নির্মাণেও এগিয়ে আসেননি। বাধ্য হয়ে চলতি বছরের ১২ ফেব্রুয়ারি দুই উপজেলার ১০ গ্রামের প্রতিনিধিদের সাথে আলোচনা করে তারা সেতুর নির্মাণ কাজ শুরু করা হয়। এটি নির্মাণে ১০ লাখ টাকা ব্যয় হতে পারে বলে সংশ্লিষ্টদের ধারনা।
খানপুর বাজার কমিটির সাধারণ সম্পাদক হারুন অর-রশিদ বলেন, দৈনন্দিন কাজে নদীর ওপারের অধিকাংশ লোকজনের প্রায় ৪ কিলোমিটার দূরে সীমাখালী বাজারে যেতো হতো। যেটা ছিল তাদের জন্য সময়সাপেক্ষ, ব্যয়বহুল ও কষ্টকর। কৃষকরা সময়মত তাদের উৎপাদিত ফসল হাটে বিক্রি করতে পারতো না। নদীর এ অংশে সেতুটি নির্মাণ হলে খুব সহজেই তারা খানপুর বাজারে যাতায়াত করা যাবে।
খানপুর দাখিল মাদরাসার সুপার এসএম ইজ্জতুল্যা বলেন, শালিখা উপজেলা থেকে প্রায় একশ’ শিক্ষার্থী নদী পার হয়ে মাদরাসায় আসে। ঝুঁকি নিয়ে তাদের নড়বড়ে বাঁশের সাঁকো পার হতে হয়। বর্ষার সময় নদীতে পানি বেশি থাকে। তখন ৩/৪ মাস তারা ক্লাস করতে আসতে পারে না।যারা ঝুঁকি নিয়ে আসতো তারা প্রায়ই শিকার হতো দুর্ঘটনার।
বাঘারপাড়ার নারিকেলবাড়িয়া ইউপি চেয়ারম্যান আবু তাহের আবুল সরদার বলেন,‘চেয়ারম্যান নির্বাচিত হওয়ার পর এখানে একটা ব্রিজ নির্মাণের জন্য স্থানীয় এমপি,উপজেলা চেয়ারম্যান,ইউএনওসহ সবার কাছে ধরনা দিয়েছি। সবাই আশ্বাস দিয়েছেন’। দু’উপজেলার মানুষ নিজেদের অর্থায়নে ব্রিজ নির্মাণ করার উদ্যোগ নেওয়ায় তাদের সাধুবাদ জানাই।’

আরও পড়ুন