'মাকে খুব দেখতে ইচ্ছা করে'

আপডেট: 08:15:04 17/03/2021



img

আব্দুল্লাহ আল মাসুদ, ঝিনাইদহ : 'আমার মাকে আপনারা দেখেছেন। মাকে খুব দেখতে ইচ্ছা করে। আমার মা নাকি পাগলী। সবাই আমাকে শুধু মারে'- এভাবেই কথাগুলো বলছিল আব্দুল্লাহ নামের এক পথশিশু। আব্দুল্লাহর বয়স পাঁচ থেকে ছয় বছর। তার সাথে দেখা হয় ঝিনাইদহ জেলার ভারতীয় সীমান্তবর্তী মহেশপুর উপজেলার ভৈরবা বাজারে।
স্থানীয়রা জানান,  ওই এলাকায় এক পাগলী থাকত। একসময় পাগলী গর্ভবতী হয়ে পড়ে। কিছুদিন পর পাগলী ফুটফুটে পুত্রসন্তান প্রসব করে। সন্তান প্রসবের কিছুদিন পরে পাগলী এলাকা ছেড়ে চলে যায়। পাগলীর গর্ভে জন্ম নেওয়া আব্দুল্লাহর উপর সমাজের অভিজাত শ্রেণীর কারো কৃপাদৃষ্টি না পড়লেও অভাগা শিশুটির ঠাই হয়েছে আরেক অভাগার ঘরে। ভৈরবা বাজারের পূর্ব দিকে সরকারের এক টুকরো খাস জমিতে টিনের তৈরি ঝুপড়ি ঘরের মালিক জোসেদা বিবি শিশুটিকে লালন পালন করছে। জোসেদা বিবি তার নাম রাখে আব্দুল্লাহ। এক ভিক্ষুক এখন তার মা। ঠিকানাহীন আব্দুল্লাহ বেড়ে উঠছে সেখানেই। বয়সের ভারে ন্ইুয়ে পড়া পালিত মা কোন রকমে আব্দুল্লাহর মুখে দু-মুঠো ভাতের জোগান দিচ্ছেন। চরম অর্থকষ্ট আর অভাব অনটনের মধ্যেও পরাজিত হয়নি আব্দুল্লাহর পালিত এই মায়ের মানবতা।
এভাবে জেলার বিভিন্ন এলাকায় বাবা-মাহীন ঠিকানা ছাড়াই বেড়ে ওঠাদের সংখ্যা নেহায়েত কম নয়। জেলার সবথেকে বেশি পথশিশুর বসবাস ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ পৌরসভাধীন মোবারকগঞ্জ রেলস্টেশনে। এখানে প্রায় অর্ধশত পথশিশু রয়েছে। যাদের মধ্যে অনন্ত ১৫ জনের বাবা-মা নেই। জন্মের পর বিভিন্ন সময় তাদের ফেলে গেছে জন্মদাতা পিতা অথবা মাতা। এরা অন্যের দেওয়া খাবার খেয়ে পথে পথে বেড়ে উঠছে। এছাড়া কালীগঞ্জে বারোবাজারে রয়েছে আরো একটি বস্তি। সেখানেও রয়েছে প্রায় অর্ধশত পথশিশু।
আব্দুল্লাহর পালিত মা জোসেদা জানান, পাগলীটা আমাদের এলাকায় ঘুরে বেড়াচ্ছিল। ওর পেটে বাচ্চা দেখে কেউ ওকে ঠাঁই দেয়নি। তখন আমি তাকে আমার বাড়িতে নিয়ে আসি। পরে আব্দুল্লাহর জন্ম হয় আমার বাড়িতে। সেখান থেকেই আমি আব্দুল্লাহকে লালন পালন করছি। তবে ওর মা কোথায় চলে গেছে জানি না। তিনি জানান,  গ্রাম ঘুরে ভিক্ষা করে নিয়ে এসে বাচ্চাটারে খাওয়াই ও নিজেরা খাই।
আব্দুল্লাহর পালিত বাবা আবদুল মজিদ জানান, ছেলেটাকে ছোট থেকে অনেক কষ্ট করে লালন পালন করেছি আমরা। এখন আমার চিন্তা আমি আর কতদিন বাঁচব। আমি মরে গেলে ছেলেটির কি হবে। এমন দিন গেছে আব্দুল্লাহকে নিয়ে আমরা না খেয়েও রাত কাটিয়েছি। আমাদের যে আয় তাতে ওর জামা কাপড় কিনে দেয়ার সামর্থ্য নেই। স্কুলে দেয়ার ক্ষমতাও নেই। কেউ কোন সাহায্যও করেনা। আব্দুল্লাহ বড় হচ্ছে, ও বুঝতে শিখছে। এখন গ্রামের বাজারে দ্বারে দ্বারে ঘুরছে। যদি সাহায্য করার মত একটা লোক থাকে তাহলে হয়তো আমরা আব্দুল্লাহকে ভালোভাবে মানুষ করতে পারতাম।
ওই গ্রামের মোশারফ আলী জানান, আব্দুল্লাহ আমাদের গ্রামের ভিক্ষুক জোসেদার ঘরে আশ্রয় পেয়েছে। তবে অর্থাভাবে সেখানে খুব খারাপ অবস্থাতেই তাদের দিনাতিপাত হয়।
ওই বাজারের চা দোকানী মুসলিম মিয়া জানান, পালক পিতা-মাতা গরীব হওয়ায় ঠিকমত খাবারও পায় না শিশু আব্দুল্লাহ। যে কারণে আব্দুল্লাহ সারাদিন বাজারে বাজারে ঘোরাঘুরি করে। আমাদের কাছে এসে বলে এটা খাব ওটা খাবো। আমরা যতদূর পারি তাকে দিই।
সোহেল আহমেদ নামে স্থানীয় এক ব্যক্তি জানান, সমাজে অনেক বিত্তশালী রয়েছেন যারা দরিদ্রদের জন্য কাজ করনে। তারা যদি এ শিশুটির পাশে দাাঁড়াতো তাহলে সে ভালোভাবে বড় হয়ে উঠতে পারতো। সমাজের জন্য কিছু করতে পারতো।
ভৈরবা বাজার এলকার স্কুল শিক্ষক মাজহারুল ইসলাম জানান, আব্দুল্লাহর কোন পরিচয় নেই।  তার মতো অনেক শিশু জন্মের পর থেকে বেড়ে উঠে অযত্ন আর অবহেলায়। এভাবেই দেশের বিভিন্ন এলকায় প্রতিদিন জন্ম নিচ্ছে অনেক শিশু। যারা বেড়ে উঠছে পথশিশু হিসেবে। এদের পরিচয় ওরা টোকাই। এরাই সময়ের সাথে সাথে হারিয়ে যেতে থাকে অপরাধের অন্ধ গলিতে। ফলে তাদের ভালোভাবে বেড়ে উঠতে সকলের সাহায্য সহযোগীতা করা উচিৎ। বিশেষ করে সরকারি একটি নজরদারি থাকলে এসব শিশুরা সরকারি বিভিন্ন এতিমখানায় বেড়ে উঠতে পারতো।
পথ শিশুদের নিয়ে কাজ করা ঝিনাইদহের মানবাধিকারকর্মী ও আমেনা খাতুন ডিগ্রী কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ আমিনুর রহমান টুকু বলেন, 'পাগলী মা হয়েছে, বাবা হয়নি কেউ। এমন সংবাদ প্রায়ই পত্রিকার পাতায় অথবা টিভি চ্যনেলে সংবাদের রসদ যোগায়। কিন্তু তা কতটুকু নাড়া দিতে পারে আমাদের সভ্য বিবেককে?  পাগলীর সাথে ঘটে যাওয়া অন্যায়ের দায় কেউ না নিলেও প্রকৃতির নিয়ম মেনে সেই পাগলী এক সময় মা হয়। এদের নিয়ে সরকারের ভাবা উচিৎ। এসব পথ শিশুদের জন্য প্রতিটি জেলায় আবাসনসহ বিশেষ শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা উচিত বলে আমি মনে করি।'
মহেশপুর উপজেলা নির্বাহী অফিসার শাশ্বতী শীল বলেন, 'শুনেছি একটি পাগলীর সন্তান একজন ভিক্ষুক মহিলা লালন-পালন করছে। ওই পরিবারটিকে প্রশাসনের পক্ষ থেকে যতটুকু সম্ভব সাহায্য করা হবে। ওই পরিবারটি যদি সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর মধ্যে না থাকে তাহলে আমরা তাকে নিরাপত্তা মধ্যে আনার ব্যবস্থা করবো।'

আরও পড়ুন