অসীম সাহসী করোনাযোদ্ধা ডা. লুবনা

আপডেট: 04:38:48 20/10/2020



img

তারেক মাহমুদ, কালীগঞ্জ (ঝিনাইদহ) : করোনাভাইরাস সংক্রমণের শুরু থেকেই জীবনের ঝুঁকি নিয়ে মানবসেবায় দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন ঝিনাইদহের এক চিকিৎসক দম্পতি।
পূর্ব-অভিজ্ঞতা নেই, নেই কোনো ভ্যাকসিন কিংবা কার্যকরী ওষুধ। তবুও কোভিড-১৯ নামের অদৃশ্য এক প্রাণঘাতী ভাইরাসের বিরুদ্ধে লড়ে যাচ্ছেন নবীন চিকিৎসকরা। তাদেরই মধ্যেই রয়েছেন ডাক্তার শামীমা শিরিন লুবনা ও তার স্বামী ডাক্তার আব্দুল্লাহিল কাফি। একমাত্র সন্তানকে বাড়ি রেখে দিন-রাতের অধিকাংশ সময় মানবসেবায় ব্যস্ত সময় অতিবাহিত এই ডাক্তার দম্পতি।
করোনা রোগীদের বাঁচাতে গিয়ে তিন তিন বার নিজেই আক্রান্ত হয়েছেন ডা. লুবনা। সেই সময়ও আইসোলেশন ও কোয়ারেন্টাইনে থেকেও রোগীদের সেবা ও হাসপাতালের অফিসিয়াল কাজ করেছেন। স্বামী-সন্তানকে আলাদা রেখে রোগীদের সেবা দিয়েছেন।
শামীমা শিরিন লুবনা কালীগঞ্জে উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। আর তার স্বামী ডা. কাফি ঝিনাইদহ সদর হাসপাতালে সার্জারি বিভাগের বিশেষজ্ঞ ডাক্তার। তাদের কর্তব্যনিষ্ঠা, দায়িত্ববোধ, একাগ্রতা, ধৈর্য্য ও সাহসিকতা রোগীসহ সাধারণ মানুষের প্রশংসা কুড়িয়েছে।
শামীমা শিরিন কালীগঞ্জে যোগদানের পর থেকে স্থানীয় চিকিৎসা সেবায় এসেছে আমূল পরিবর্তন। মাত্র দশ মাসে রোগীদের হাসপাতালমুখী করতে পেরেছেন তিনি। হাতপাতালের উন্নয়নেও রেখেছেন ব্যাপক ভূমিকা। হাসপাতালের প্রসূতি, গাইনি এবং সার্জারি বিভাগে অপারেশন নিয়মিতকরণ, কমপ্লেক্সের সামনে নতুন গেট নির্মাণ, বিভিন্ন স্থানে ডাস্টবিন স্থাপন, হাসপাতালে ফ্লু কর্নার স্থাপন, সৌন্দর্য বর্ধনে বাগান তৈরি, দর্শনার্থীদের জন্য ওয়েটিং রুম তৈরি, মেডিকেল অফিসারদের জন্য দুটি কোয়ার্টার মেরামত ও ডেন্টাল ইউনিটের জন্য নতুন যন্ত্রপাতি কেনাসহ নানা উন্নয়নমূলক কাজ হয়েছে তার হাত দিয়ে। এখন আর মানুষ বেসরকারি হাসপাতাল বা ক্লিনিকগুলোকে অপরিহার্য মনে করে না।
২০১৯ সালের ৩১ ডিসেম্বর কালীগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা হিসেবে যোগদান করেন ডা. লুবনা। ১৯৯৮ সালে জেলার কালীগঞ্জ শহরের ছলিমুন্নেছা বালিকা বিদ্যালয় থেকে মাধ্যমিক ও একই শহরের মাহতাব উদ্দীন ডিগ্রি কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পাশ করেছিলেন তিনি। এরপর ভর্তি হন খুলনা মেডিকেল কলেজে। সেখান থেকে পাশের পর ২৮তম বিসিএস দিয়ে স্বাস্থ্য ক্যাডারভুক্ত হন।
লুবনা চিকিৎসক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন করেন তার শৈশবের স্মৃতিবিজড়িত কালীগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে সহকারী মেডিকেল অফিসার হিসেবে। এরপর টাঙ্গাইল, নাটোর ও ঝিনাইদহ সদর হয়ে আবারো জন্মস্থান কালীগঞ্জে ফিরে আসেন। তবে, এবার মেডিকেল অফিসার নয়, উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা হিসেবে। এখানে যোগদানের মাত্র তিন মাস পর শুরু হয় করোনার বিস্তার। স্বাস্থ্য বিভাগ থেকে সতর্ক থাকতে বলা হয় চিকিৎসকদের। এই বিষয়ে প্রশিক্ষণ ও নির্দেশনাও দেওয়া হয়। বেড়ে যায় দায়িত্ব কর্তব্য আর ব্যস্ততা। দেশে করোনা সংক্রমণের শুরুতেই আইইডিসিআর-এর নির্দেশনায় চলতে থাকে তার কার্যক্রম। এরপর ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে কয়েক দফা প্রশিক্ষণ নেন। শুরু হয় হাসপাতালের নিয়মিত ডিউটির পাশাপাশি চিকিৎসা নিতে আসা লোকদের করোনা সন্দেহভাজন হিসেবে চিহ্নিত করে নমুনা সংগ্রহের ব্যবস্থা করা, করোনার উপসর্গ নিয়ে আসা লোকদের নমুনা সংগ্রহ করা, তাদের প্রাথমিক চিকিৎসাপত্র দেওয়া, শনাক্ত হওয়া রোগীদের হাসপাতাল অথবা বাসায় (আইসোলেশন/ কোয়ারেন্টাইন) চিকিৎসার বিষয়ে নানা সিদ্ধান্ত ও পরামর্শ প্রদানের কাজে ব্যস্ত সময় পার করতে থাকেন। এতকিছুর মধ্যেও প্রশাসনিক দায়িত্বের অংশ হিসেবে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ, মিডিয়াকর্মী, রোগী ও তাদের স্বজনসহ আরো অনেকের সঙ্গে কথা বলতে হয়, তথ্য দিতে হয়। পরম ধৈর্যের সঙ্গে সব দিক সামাল দিচ্ছেন ডা. শামীমা শিরিন।
অন্যদিকে, তার স্বামী ডা. কাফি ঝিনাইদহ সদর হাসপাতালে সুনামের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করছেন। ডা. কাফির শরীরেও দুইবার করোনা হানা দিয়েছে।
কালীগঞ্জ উপজেলা হাসপাতালে এখন পর্যন্ত ৪৩১ করোনা রোগী শনাক্ত হয়েছেন। নমুনা সংগ্রহের পর পরীক্ষা করা হয়েছে সাত হাজার ৯৩৬ সন্দেহভাজন ব্যক্তির। রোগী বাড়ার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে ডা. লুবনার ব্যস্ততা। এরমধ্যে উপজেলার ১১টি ইউনিয়নের কমিউনিটি ক্লিনিক দেখতে হয় তাকে। অবিরাম পরিশ্রমে শারীরিক ধকল গেলেও মনের জোরটা ঠিকই ধরে রেখেছেন।
ডাক্তার শামীমা শিরিন বলেন, ‘চাকরি বলে নয়, ঝুঁকি থাকা সত্ত্বেও মানবিক কারণে কাজ করে যাচ্ছি। টানা ডিউটির পর বাসায় গেলেও জরুরি প্রয়োজনে আবার আসতে হয়। সেটা দিনে হোক আর গভীর রাতেই হোক। কাজে এতটাই ব্যস্ত থাকি যে, কখন দিন যায়, রাত পার হয় তা অনেক সময় টের পাই না। সবচেয়ে বেশি মিস করি আমাদের সন্তানকে। খারাপ লাগে, ক্লান্তিও আসে, আক্রান্তের ঝুঁকিও আছে, তবুও এখান থেকে পিছু হটার সুযোগ তো নেই। মানবসেবার ব্রত নিয়েই তো এমন পেশায় যোগ দিয়েছি।’