অর্ধেক গণপরিবহন চালানো কতটা যৌক্তিক

আপডেট: 10:33:52 10/08/2021



img

আনোয়ার হোসেন: বুধবার থেকে দৈনিক মোট গণপরিবহনের অর্ধেক চলাচল করতে পারবে—সরকারের এমন সিদ্ধান্ত কতটা যৌক্তিক, সেই প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। আমাদের গণপরিবহনব্যবস্থার মালিকানার ধরন, নিয়ন্ত্রণ সংস্থার সক্ষমতা এবং শ্রমিকদের নিয়োজিত করার পদ্ধতি—এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে অন্তরায়।
করোনা সংক্রমণ পরিস্থিতিতে স্বাস্থ্যবিধি মেনে গণপরিবহন চালানোই যেখানে মূল লক্ষ্য, সেখানে সরকারের নতুন এই সিদ্ধান্ত তা আরও নাজুক করে তুলতে পারে। পাশাপাশি সাধারণ যাত্রীরাও দুর্ভোগে পড়তে পারেন, বাড়তি ব্যয়ের বোঝাও চাপবে।
প্রায় দেড় বছর ধরে দেশে করোনা মহামারি চলমান। করোনা সংক্রমণ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এরই মধ্যে বিধিনিষেধ, কঠোর বিধিনিষেধ, শিথিল বিধিনিষেধ নামের নানা সিদ্ধান্ত দেখেছে দেশের মানুষ। বেশির ভাগ সিদ্ধান্তই এসেছে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে।
তবে বরাবরই বিধিনিষেধ বা লকডাউনের কেন্দ্রে থাকে গণপরিবহন তথা ট্রেন, লঞ্চ, বাস ও ফেরি। সাধারণ মানুষের এসব বাহনই বড় ভরসা। এগুলো ভিন্ন ভিন্ন সংস্থার নিয়ন্ত্রণে পরিচালিত হয়। অংশীজন হিসেবে আছেন বেসরকারি উদ্যোক্তারা।
মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে সিদ্ধান্ত দেওয়ার আগে সংশ্লিষ্ট সংস্থা ও অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনা করা হচ্ছে না। ফলে সকালে সিদ্ধান্ত দিয়ে রাতে তা পাল্টাতে দেখা গেছে। বিধিনিষেধ বাস্তবায়নেও হযবরল অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে।
এই অব্যবস্থাপনার পেছনে আমলাদের ওপর অতি নির্ভরতাকে দায়ী করে থাকেন অনেকে। যখনই কোনো নতুন সিদ্ধান্ত আসে, তখন অংশীজনদের কেউ কেউ তাই রসিকতা করে বলে থাকেন, এক দিন পর এই সিদ্ধান্তও পরিবর্তন হয় কি না দেখেন।
করোনার সংক্রমণের উচ্চ ঝুঁকির মধ্যেই সরকার হঠাৎ করে পবিত্র ঈদুল আজহা উপলক্ষে ১৫ থেকে ২২ জুলাই পর্যন্ত বিধিনিষেধ শিথিলের ঘোষণা দেয়। তখনই জানিয়ে দেওয়া হয়, ২৩ জুলাই থেকে ৫ আগস্ট পর্যন্ত কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করা হবে। বন্ধ থাকবে সব শিল্পকারখানা। এই সুযোগে এক কোটির বেশি মানুষ ঢাকা ছাড়ে।
৩০ জুলাই হঠাৎ সিদ্ধান্ত দেওয়া হয় যে ১ আগস্ট থেকে রপ্তানিমুখী পোশাক কারখানা খুলবে। গণপরিবহন বন্ধ রেখেই কারখানা খোলার এই সিদ্ধান্ত নেওয়ার ফলে শ্রমিকেরা দূরদূরান্ত থেকে ভ্যানে, ট্রাকে ও হেঁটে কাজে যোগ দেওয়ার জন্য রওনা দেন।
বাড়তি খরচ আর দুর্ভোগ নিয়ে অধিকাংশ শ্রমিক ঢাকায় চলে আসার পর সরকার শ্রমিক আনার কাজে দেড় দিনের জন্য বাস চলতে পারবে বলে মৌখিক নির্দেশনা দেয়। কিন্তু অধিকাংশ শ্রমিক চলে আসার কারণে এই সিদ্ধান্তে শ্রমিকদের কোনো কাজে লাগেনি।
গত বছরও পোশাক কারখানা বন্ধ ও খোলা নিয়ে সিদ্ধান্তে নানা অসংগতি ছিল। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ বিভিন্ন মহলে এই নিয়ে সমালোচনার পর সিদ্ধান্ত পাল্টানোর ঘটনা ঘটেছে।
একইভাবে ফেরি চালু রেখে বাস বন্ধ করে দেওয়ার ঘোষণা এসেছে বিভিন্ন সময়। এ সময় ফেরিগুলোতে উপচে পড়া ভিড়ে স্বাস্থ্যবিধির কোনো বালাই ছিল না।
এ পর্যন্ত সরকারের লকডাউন এবং বিধিনিষেধসংক্রান্ত সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে কয়েকটি দুর্বলতা দেখা যাচ্ছে। এগুলো হচ্ছে—১. সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তর ও অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনা না করা। ২. পোশাক কারখানা খোলার ক্ষেত্রে এই খাতের মালিক সংগঠনগুলোর ইচ্ছাকেই গুরুত্ব দেওয়া। ৩. পোশাক খাতের শ্রমিক এবং নিম্ন আয়ের মানুষের দুর্ভোগের বিষয়টি বিবেচনায় না নেওয়া। ৪. স্বাস্থ্যবিধি মানার ক্ষেত্রে বিজ্ঞান বা বাস্তবতার চেয়ে সরকারি কর্মকর্তাদের বিবেচনাবোধকেই বেশি গুরুত্ব দেওয়া। ৫. ওপর থেকে নেওয়া সিদ্ধান্ত কীভাবে বাস্তবায়ন হবে, সেই বিষয়ে মাঠপর্যায়ে স্পষ্ট নির্দেশনা না থাকা।
এবার প্রতিদিন অর্ধেক গণপরিবহন চালু রাখার নতুন যে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, এর মধ্যেও বিজ্ঞান বা বাস্তবতাবোধের অভাব দেখা যাচ্ছে। ফলে বেশ কিছু সমস্যার উদ্ভব হতে পারে।

পরিবহনব্যবস্থাই এমন যে অর্ধেক চালু রাখা কঠিন
রাজধানী ঢাকাসহ বড় শহর এবং দূরপাল্লার পথে প্রায় এক লাখ বাস-মিনিবাস চলাচল করে। এসব বাসের মালিক আছেন প্রায় ৪০ হাজার। সবাই সংঘবদ্ধ বা বড় কোম্পানির অধীনে নন। এমনও আছে যে তিন-চারজন মিলে একটা বাসের মালিক। একজনের একটি বাসের মালিকানাই বেশি। অনেক পরিবহনমালিক মিলে একটা কোম্পানি করে বাস চালিয়ে থাকেন। এর বাইরে দেশে বড় কোম্পানি আছে ২০টির মতো। এসব বড় কোম্পানিতে এক মালিকের অনেক বাস চলে।
এই জটিল মালিকানা ব্যবস্থায় অর্ধেক বাস চালু রাখার যে সিদ্ধান্ত, তা বাস্তবায়ন করা অত্যন্ত কঠিন। প্রথমত, যার একটি বাস আছে বা একাধিক মালিকের যদি একটি বাস থাকে, তাহলে সেখানে অর্ধেক চালানোর সুযোগ নেই। এ ছাড়া প্রভাবশালী পরিবহনমালিক ও শ্রমিকনেতারা রুট কমিটির নামে বিভিন্ন বাসটারমিনাল নিয়ন্ত্রণ করেন। কোন মালিকের বাস চলবে এবং কারটা বন্ধ থাকবে—এটা ঠিক করতে গিয়ে প্রভাবশালীরা চাঁদাবাজির আশ্রয় নিতে পারেন। মনে রাখা দরকার, গণপরিবহনে চাঁদাবাজি দীর্ঘদিন ধরে চলে আসছে।
এ ছাড়া দীর্ঘদিন শ্রমিকেরা বেকার। এখন অর্ধেক বাস চালাতে হলে কাকে বসিয়ে রেখে কাকে চালানোর সুযোগ দেওয়া হবে, এটাও একটি জটিল বিষয়।
মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে বলা হয়েছে, স্থানীয় প্রশাসন সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে অর্ধেক বাস চালানোর বিষয়টি নিশ্চিত করবে। মঙ্গলবার কিছু জেলা ও বিভাগীয় শহরে প্রশাসনের পক্ষ থেকে পরিবহনমালিক-শ্রমিকনেতাদের সঙ্গে বৈঠকের খবর পাওয়া গেছে। কিন্তু পরিবহন খাত নিয়ন্ত্রণ হয় ঢাকা থেকে। কেন্দ্রীয় নেতাদের সঙ্গে কোনো বৈঠক বা আলোচনার খবর পাওয়া যায়নি।

স্বাস্থ্যবিধি মানা কঠিন হবে
সড়ক পরিবহনের নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিআরটিএ মঙ্গলবার এক আদেশে বলেছে, যত আসন, তত যাত্রী পরিবহন করা যাবে। তবে কোনোভাবেই আসনের অতিরিক্ত বা দাঁড় করিয়ে যাত্রী পরিবহন করা যাবে না। কিন্তু দীর্ঘদিন পরিবহন বন্ধ থাকার পর স্বাভাবিকভাবেই যাত্রীর চাপ বাড়বে। এ অবস্থায় আসনের অতিরিক্ত যাত্রী বহন না করার নির্দেশনা কতটা মানা হবে, সেই প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।
গত ৩১ জুলাই পোশাকশ্রমিকদের আনার জন্য বাস চলাচলে নিষেধাজ্ঞা শিথিল করা হয়। কিন্তু শ্রমিকেরা আগেই ঢাকায় চলে আসার কারণে খুব বেশি বাস চলেনি। অর্থাৎ যাত্রী থাকলে পরিবহনমালিক-শ্রমিকেরা তাদের নেবেনই। না থাকলে বাস কম চলবে—এর জন্য নির্দেশনার দরকার নেই।
দেশে স্বাভাবিক সময়ে দিনে সাড়ে তিনশ’ যাত্রীবাহী ট্রেন চলাচল করে। সংস্থাটি ১১৪টি ট্রেন চালানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। পবিত্র ঈদুল আজহার সময়ও রেল একই সংখ্যক ট্রেন চালিয়েছিল। সে সময় অর্ধেক আসন ফাঁকা রাখার সিদ্ধান্ত থাকলেও গাদাগাদি করে যাত্রী পরিবহনের চিত্র আমরা দেখেছি। একই অবস্থা দেখা গেছে লঞ্চ ও ফেরিতে।

ভাড়া–নৈরাজ্য হতে পারে
একটা সময়ে নির্ধারিত ভাড়ার চেয়ে ৬০ শতাংশ বাড়তি নেওয়ার শর্তে অর্ধেক আসন ফাঁকা রেখে বাস চালানোর সিদ্ধান্ত ছিল। এখন যত আসন, তত যাত্রী বহনের কারণে স্বভাবতই বাড়তি ভাড়া আদায় করা যাবে না। কিন্তু পরিবহনমালিকেরা বলছেন, অর্ধেক বাস চলাচল করলে তাদের আয় কমে যাবে। এ অবস্থায় নির্ধারিত ভাড়া হার মেনে সব পরিবহনের চলাচল নিশ্চিত করা কঠিন।
বিআরটিএ এ-সংক্রান্ত নির্দেশনা দিলেও সারা দেশে তা বাস্তবায়ন হচ্ছে কি না, তা দেখার মতো লোকবল বা অবকাঠামো নেই সংস্থাটির। ফলে সাধারণ যাত্রীদের ওপর বাড়তি ভাড়ার বোঝা চাপতে পারে। এই নিয়ে যাত্রী ও পরিবহনশ্রমিকদের বচসারও আশঙ্কা আছে।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হয়রানির আশঙ্কা
বিধিনিষেধে কিছু ক্ষেত্রে মাইক্রোবাস, ট্রাক, হিউম্যান হলার, মোটরসাইকেল ও ভ্যানে যাত্রী পরিবহন হয়েছে। এসব যানের মালিক-শ্রমিকদের কাছ থেকে চাঁদা নিয়ে চলাচল নির্বিঘ্ন করার অভিযোগ আছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিরুদ্ধে।
বিশৃঙ্খল ব্যবস্থার কারণে অর্ধেক গণপরিবহন হিসাব করার আসলে কোনো বাস্তবসম্মত ব্যবস্থা নেই। ফলে রাস্তায় নামানোর পর যেকোনো বাস আটকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী হয়রানি করতে পারে। এতে চাঁদাবাজির সুযোগ তৈরি হবে।

শেষ কথা
মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের নেওয়া সর্বশেষ সিদ্ধান্তের বিষয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন খোদ সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের। গত সোমবার তিনি প্রশ্ন রেখে বলেন, ‘অর্ধেক বাস চলবে, আর অর্ধেক চলবে না, এটার নিশ্চয়তা দেবে কে? বিষয়টি আমাদের মন্ত্রণালয়, বিআরটিএর সঙ্গে সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে একটু আলোচনা করে নিলে ভালো হতো। বিষয়টি এখন জেলা প্রশাসন ও পুলিশের ওপর ন্যস্ত করা হয়েছে। তারা যদি সরকারের এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করতে পারে, ভালো কথা। এটা আমাদের এখতিয়ার নয়।’
সরকারের প্রভাবশালী মন্ত্রী এবং ক্ষমতাসীন দলের দ্বিতীয় শীর্ষ নেতার এই প্রতিক্রিয়া বলে দেয়, যে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে সমন্বয়হীনতা প্রকট। ফলে এর বাস্তবায়ন মাঠ প্রশাসনের ইচ্ছা-অনিচ্ছার ওপর নির্ভরশীল। এতে সরকারের লাভ-ক্ষতি যা-ই হোক, ভোগান্তির শিকার হতে হয়, খরচের বোঝা বাড়ে সাধারণ মানুষের। পরিতাপের বিষয় হচ্ছে, সাধারণ মানুষের সুবিধা–অসুবিধার বিষয়টি নীতিনির্ধারকদের বিবেচনায় কমই থাকে।
[প্রথম আলোর বিশ্লেষণ]